ব্রেকিং নিউজ:
গোলাম আযমের ৯০ বছরের জেল
মাহবুব সাঈফ    জুলাই ১৫, ২০১৩, সোমবার,     ০৮:৩৩:৪১

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল পরিকল্পক ও প্ররোচক গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড বা আমৃত্যু জেলে থাকার সাজা দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
সোমবার বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী, ষড়যন্ত্রকারী, উস্কানিদাতা, প্ররোচণাকারী ও সম্পৃক্ততাকারী হিসেবে পাঁচ ধরনের ৬১টি অভিযোগে গোলাম আযমকে বিভিন্ন মেয়াদে মোট ৯০ বছর কারাদণ্ডের রায় দেন।
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সবগুলোই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হলেও বয়সাধিক্যের কারণে যোগ্য শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বদলে আমৃত্যু কারাদণ্ডের এ সাজা দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল-১।
মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার অভিযোগে ১০ বছর করে ২০ বছর, উস্কানি ও সহযোগিতার অভিযোগে ২০ বছর করে ৪০ বছর এবং সবশেষ চিঠি দিয়ে ৩৮ জনকে হত্যার নির্দেশের অভিযোগে ৩০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয় গোলাম আযমকে। সবমিলিয়ে ৯০ বছর কারাদণ্ড একটির পর একটি কার্যকর হবে বলে রায়ে বলা হয়েছে।
রায়ে আরো বলা হয়েছে, রাজাকার, আলবদর এবং আল-শামসসহ নানা বাহিনী গঠন করে গোলাম আযম মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তার দলের নেতা-কর্মীদের অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাই সমস্ত অপরাধের দায় তার কাঁধেই বর্তায়।
সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধী গোলাম আযমকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেল থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এর কিছুক্ষণ পরই এজলাসে যান ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন বিচারপতি।
পরে সকাল ১১টা ৫ মিনিটে রায় ঘোষণা শুরু হয়। এ সময় আইনজীবী, লেখক, গবেষক এবং সাংবাদিকসহ বিশিষ্টজনেরা এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। জনাকীর্ণ আদালতে ২৪৩ পৃষ্ঠার রায়ের ৭৫ পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপ পড়ার আগে সূচনা বক্তব্য দেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর।
এরপরই রায়ের প্রথম অংশে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বিচারপতি আনোয়ারুল হক মন্তব্য করেন যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ছিল নেতিবাচক। আর দ্বিতীয় অংশে মামলার বিচারিক কার্যক্রমের সার-সংক্ষেপ পড়েন বিচারপতি জাহাঙ্গির হোসেন। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগের সবগুলোই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে বলে জানান তিনি।
পরে রায়ের মূল অংশ পড়েন চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর। ৭১ এর গণহত্যাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহত্যা এবং ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চ লাইটের নামে হত্যাযজ্ঞকে জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড বলে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল প্রধান মন্তব্য করেন স্বাধীনতা বিরোধীদের সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেয়া উচিত নয়।
এরপরই রায়ের শেষাংশে গোলাম আযমের শাস্তি ঘোষণা করা হয়।
রায় কার্যকর করা সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, "তিনি যদি জীবিত থাকেন তাহলে ৯০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, কিন্তু ৯০ বছর হওয়ার আগেই যদি তিনি মারা যান তাহলে কাস্টডিতে তিনি মারা যাবেন। অন্যান্য ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের ‘ক্যালকুলেটিভ জাজমেন্ট’ দেয়া হয়।"
মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী জানান, "তার (গোলাম আযম) শারীরিক অবস্থা সবকিছু মিলে তারা (ট্রাইব্যুনাল) হয়তো একটি অবজার্ভেশনে এসেছেন।"
এর আগে এক বছর ধরে চলা বিচারিক কার্যক্রমে পুরো সময় অনুপস্থিত থাকলেও রায়ের দিন ট্রাইব্যুনালে হাজির হন গোলাম আযম। তবে ট্রাইব্যুনালে কোনো কথা বলেননি তিনি। রায়ের পর তাকে আবার নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেলে। এখানে আনার পরপরই তাকে কয়েদির পোশাক পরানো হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এর বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর আমির ছিলেন গোলাম আযম। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার ঠিক আগে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান গোলাম আযম। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে ফেরেন তিনি।
গোলাম আযমের এই রায়ের মধ্য দিয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের ৫টি মামলার বিচার শেষ হলো। এর আগে ২১ জানুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রথম রায়ে ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াত নেতা আবুল কালাম আযাদকে (পলাতক)মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি একই ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেয়।২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে এবং ৯ মে ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াতর আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসির আদেশ দেয়।ঘোষিত ৪টি রায়ের মধ্যে তিনটিই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।

এম. এস./১৪: ২৫
বিভাগ: দেশযোগ   দেখা হয়েছে ৮৫৯ বার.

 

শেয়ার করুন :

 
মন্তব্য :