ব্রেকিং নিউজ:
স্যামুয়েলসের শতকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতেছে ৪ উইকেটে
ফাহিম রহমান, মাহবুব সাঈফ    ডিসেম্বর ০৫, ২০১২, বুধবার,     ১০:২৭:৪৮

 

সুনীল নারাইনের স্পিন-বিষে আর মারলন স্যামুয়েলসের শতকে তৃতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে ৪ উইকেটে হারিয়ে সিরিজে টিকে থাকলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মিরপুরের দিন-রাতের ম্যাচে টসে হেরে আগে ব্যাট করে ৪৯.১ ওভারে সব উইকেট খুইয়ে ২২৭ রান তোলে বাংলাদেশ। জবাবে মারলন স্যামুয়েলসের চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরিতে ৩ ওভার বাকি থাকতেই জয় তুলে নেয় সফরকারীরা।
খুলনা খুলে দিয়েছিলো জয়ের দুয়ার, ঢাকাও কি ঢেকে দেবে ক্যারিবিয়ান গৌরব? মহাচাপে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে, আর যাই হোক শিশিরে অন্তত বাংলা স্পিনের ধারতো কমবে।
বিজয়ের মাসে আনামুল হক বিজয়ের ব্যাটে শুরুটা মন্দ হয়নি-নির্ভরতার প্রতীক তামিম ইকবালও খেলছিলেন বল পরখ করে। দলকে ভালো সূচনা এনে দেয়া এ উদ্বোধনী জুটি ভাঙ্গে ৫৭ রানে, যখন ১৩তম ওভারে ডানহাতি স্পিনার সুনীল নারাইনের বল কাট করতে গিয়ে তামিম (২২) তালুবন্দী হলেন উইকেটরক্ষক ডেভন থমাসের।
প্রত্যয়ী এ জুটি ভাঙ্গার পরপরই যেন নেমে এলো ভূমিধ্বস। বাংলাদেশের বিপক্ষে আগের ৬ ইনিংসে ৪ উইকেট নেয়া সুনীল নারাইন ফনা তুললেন। এক বল পরেই সাজঘরে ফেরত পাঠালেন নাঈম ইসলামকে(৪)-শর্ট কাভারে কাইরন পোলার্ডের ক্যাচ বানিয়ে। ৯ বলের মধ্যেই তার তিন ছোবলে ঘায়েল টপ-অর্ডারের ৩ ব্যাটসম্যান- তামিম, নাইম আর বিজয়।
১৫তম ওভারের ৩য় বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলে বিদায় করেন আগের ম্যাচে শতক করা আনামুল হক বিজয়কে। আগের বলেই ক্যাচ তুলেও নো বলের সৌজন্যে জীবন পাওয়া বিজয় কাজে লাগাতে পারেননি পুনরীজ্জবনের সেই সুযোগ। এর আগে ব্যক্তিগত ৮ রানে রবি রামপলের বলে ড্যারেন ব্রাভোর হাতেও একবার জীবন পাওয়া বিজয় আউট হবার আগে করেন ৩৩ রান, ৫৩ বলের মোকাবেলায়- ৩টি চার ও ১টি ছক্কায়।
দু ম্যাচ হারা ক্যারিবিয়ানদের বদলে ফেলা ছকও এদিন কাজে দিয়েছিল। আন্দ্রে রাসেলের বদলে সুযোগ পাওয়া বীরাসামি পারমল অভিষেক ম্যাচে নিজের ৩য় ওভারের প্রথম বলে তুলে নেন নাসির হোসেনকে (৬)- শর্ট কাভারে পোলার্ডের ক্যাচ বানিয়ে। দুই স্পিনারের ঘূর্ণিতে বিনা উইকেটে ৫৭ থেকে স্বাগতিক বাংলাদেশ ধুঁকতে থাকে ৭৮ রানে ৪ উইকেট খুইয়ে।
এরপর কিছুটা প্রতিরোধ, বিপদ সামাল দেবার চেষ্টা। টাইগারদের মান রক্ষায় সামনে থেকে লড়লেন অধিনায়ক আর সহ-অধিনায়ক। পঞ্চম উইকেটে মুমিনুল হকের (১২) সঙ্গে ৩২ ও ষষ্ঠ উইকেটে সহ-অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের সঙ্গে ৫৮ রানের দুটি কার্যকর জুটি গড়ে বাংলাদেশ শিবিরে স্বস্তি ফেরান অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম।
৩৫ ওভার শেষে ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতে যাওয়া বাংলাদেশের রানের গতি বাড়াতে গিয়েই হয়তো ফের দলকে চাপে ফেলে দেন মুশফিক। ৩৬ তম ওভারের শেষ বলে বাঁহাতি পারমলকে তুলে মারতে গিয়ে স্যামির হাতে ধরা পড়ে বিদায় নেন ৫৮ বলে ৩৮ রান করা টাইগার অধিনায়ক মুশফিক।
দু’ ওভার পরই নারাইনের ৪র্থ শিকারে পরিণত হন মাশরাফি বিন মুর্তজা। আগের ম্যাচে ধুম-ধারাক্কা ব্যাটিং করা মাশরাফি এদিন স্ট্যাম্পড হন ১১ বল খেলে-রানের খাতা খোলার আগেই। ফলে, কার্যত ভেস্তে যায় বাংলাদেশের পাওয়ার প্লের সুবিধা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা। পাওয়ার প্লে’র ৫ ওভারে টাইগাররা তোলে মাত্র ১৪ রান;২ উইকেট হারিয়ে।
এরপরও একাকী লড়াই চালিয়ে গেছেন মাহমুদ্দুল্লাহ। অষ্টম উইকেটে সোহাগ গাজীর সঙ্গে তার ৩৯ রানের জুটির সৌজন্যে দুশ পেরুয় বাংলাদেশ। সপ্তম অর্ধশতকে পৌঁছে মাহমুদুল্লাহ বিদায় নেয়ার আগে করেন ৫২ রান। তার ৭০ বলের ইনিংসে ছিল ৩টি চার ও ১টি ছক্কার মার।
স্মিথের করা ৪৬ তম ওভারের শেষ বলে স্যামির হাতে ধরা পড়ে দলীয় ২১০ রানে সহ-অধিনায়কের বিদায়ের পর আর বেশি এগোয়নি বাংলাদেশের ইনিংস। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়া সোহাগের ৩০ রানে ভর করে,৪৯ ওভার ১ বলে অল-আউট হওয়ার আগে টাইগারদের সংগ্রহ দাড়ায় ২২৭ রান।
৩৭ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেরা বোলার সুনীল নারাইন। এছাড়া পারমল(২/৪০) ও অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি(২/৪৬) দুটি করে উইকেট নেন।
মিরপুরের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে বাংলাদেশের করা ২২৭ রানের মাঝারি মানের এ স্কোরকে বাঁচিয়ে খেলায় জিততে হলে আগে-ভাগে ফেরাতে হবে মারকূটে ক্রিস গেইলকে। বাংলাদেশ সফরে রানের জন্য লড়াই করা গেইলের বিরুদ্ধে ১ম ওভারেই মেডেন তুলে নেন সোহাগ গাজী। ১০ ডট বল খেলে সবে মাশরাফিকে চার মেরে রানের খাতে খুলেছেন, এর পরের বলেই উইকেটের পেছনে ক্যাচ। আগের ম্যাচের মতো এদিনও গেইলকে যখন গিললেন মাশরাফি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান তখন ১৫।
সিরিজ বাঁচানোর চাপ নিয়েই সতর্কতার সাথে সংযত মেজাজে শুরু করলেন কাইরন পাওয়েল আর মারলন স্যামুয়েলস। এমনই শুরু, যার শেষ টানতে শীতের রাতে গলদঘর্ম টাইগার বোলাররা। দ্বিতীয় উইকেটে দু’জনার ১১১ রানের জুটিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় ক্যারিবীয়রা। বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এটাই সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।
সিঙ্গেলসের ওপর নির্ভর করে রানের চাকা সচল রাখার পাশাপাশি প্রায় প্রতি ওভারেই দেখে শুনে আলগা বলকে সীমানা পার করেছেন স্যামুয়েলস। লেন্ডল সিমন্সের বদলে খেলতে নামা পাওয়েলকে ৪৭ রানে স্ট্যাম্পড করে বিপজ্জনক এ জুটি ভাঙ্গেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ।
এর পর বেশিক্ষন উইকেটে টেকেননি ড্যারেন ব্রাভো- দলীয় ১৫৮ রানে নাঈম ইসলামের বলে সোহাগ গাজীকে ক্যাচ দিয়ে আউট অপয়া ১৩ রান করা ব্রাভো। পাওয়ার প্লেতে ডোয়াইন স্মিথ (৪) ও কাইরন পোলার্ডকে (১) ফিরিয়ে দিয়ে ক্যারিবীয় শিবিরে হালকা একটা ধাক্কাও দিয়েছিলেন আব্দুর রাজ্জাক।
কিন্তু অন্য প্রান্তে অবিচল দৃঢ়তায় রান তুলে দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দেন মারলন স্যামুয়েলস। ১৪৯ বলের মোকাবেলায় গড়া ১২৬ রানের তাঁর ক্যারিয়ার সেরা এই ইনিংসে ছিল ১৭টি চার ও দুটি ছয়ের মার।
৫৩ বলে অর্ধশতক পূরণের পর শতকে পৌঁছুতে সংযত স্যামুয়েলস খেলেন ১৪০ বল। ৪৩.৫ ওভারে মুমিনুল হককে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট অঞ্চলে ঠেলে দিয়ে দ্রুত ১ রান নিয়ে শতক পূরণের পথে টাইগারদের তৎপর ফিল্ডিং-এ থার্ড আম্পায়ারের সবুজ সংকেতের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় স্যামুয়েলসকে। অবশ্য এর আগেও ব্যক্তিগত ১৬, ৯৫ ও ৯৬ রানে তিনবার জীবন পেয়েছিলেন তিনি।
ডান-হাতি জ্যামাইকান ব্যাটসম্যান মারলন স্যামুয়েলসের এই চতুর্থ শতক উপমহাদেশের মাটিতে তাঁর তৃতীয় আর চলতি বছরে তাঁর দ্বিতীয় অর্জন ।
সেঞ্চুরির পর খোলস ছেড়ে বাইরে আসা স্যামুয়েলস ব্যাট চালান দানবীয় উম্মত্ততায়; রুবেল হোসেনের করা ৪৫ তম ওভার থেকে ৩টি চার ও ২টি ছক্কা হাঁকিয়ে একাই তুলে নেন ২৪ রান।
শেষ পর্যন্ত দলীয় ২২২ রানে মাশরাফির বলে স্কোয়ার লেগ সীমানায় যখন মাহমুদুল্লাহর হাতে ধরা পড়েন স্যামুয়েলস, তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয় নিশ্চিত হয়ে গেছে সহজতম সমীকরণে- ২৪ বলে দরকার ৬ রান, হাতে আছে তখনো ৪ উইকেট। ৮ নম্বরে নামা অধিনায়ক ড্যারেন স্যামির কোনোই সমস্যা হয়নি ডেভন থমাস নিয়ে সিরিজে নিজেদের প্রথম জয় তুলে নিতে।
১৮ বল বাকি থাকতেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ পায় সিরিজ বাঁচানো জয়।
বাংলাদেশের পক্ষে রাজ্জাক ও মাশরাফি দুটি করে উইকেট নেন-উভয়েই ৩৪ রান খরচায়।
স্পিন-বিষে ৪ টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যানকে ঘায়েল করে বাংলাদেশকে মাঝারি সংগ্রহে আটকে দিয়ে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সুনীল নারাইনকে ছাপিয়ে স্যামুয়েলস পেয়েছেন ম্যাচ সেরার পুরষ্কার -ক্যারিয়ার সেরা ১২৬ রানের সুবাদে।
পাঁচ ম্যাচ সিরিজের প্রথম দুই ওয়ানডে জিতে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা টাইগাররা শুক্রবার চতুর্থ ওয়ানডেতে ক্যারিবীয়দের মুখোমুখি হবে সিরিজ জয়ের আশায়।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ ২২৭ (তামিম ২২, বিজয় ৩৩, নাঈম ৪, মুশফিক ৩৮, নাসির ৬, মুমিনুল ১২, মাহমুদুল্লাহ ৫২, মাশরাফি ০, সোহাগ ৩০, রাজ্জাক ৩, রুবেল ১*; সুনীল ৪/৩৭, পারমল ২/৪০, স্যামি ২/৪৬, স্মিথ ১/১৪, গেইল ১/৩৬)
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ২২৮/৬ (গেইল ৪, পাওয়েল ৪৭, স্যামুয়েলস ১২৬, ব্রাভো ১৩, স্মিথ ৪, পোলার্ড ১, থমাস ১২*, স্যামি ১*; রাজ্জাক ২/৩৪, মাশরাফি ২/৩৪, নাঈম ১/২১, মাহমুদুল্লাহ ১/৪৩)

এফ. আর./এম. এস./২১.৩০
বিভাগ: খেলাযোগ   দেখা হয়েছে ৮৯৫ বার.

 

শেয়ার করুন :

 
মন্তব্য :