ব্রেকিং নিউজ:
সবুজ মেঘের ছায়ায়
    জুন ১৯, ২০১২, মঙ্গলবার,     ০৭:৫৯:৫৬

 

সময়টা ছিল অনেক রুক্ষ। শুকিয়ে যাওয়া ঝরা পাতা, বসন্ত বাতাসে উড়ে যাওয়া ধুলোআর তৃষ্ণার্ত মাটি। সঙ্গে কড়া রোদ। বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আকাশটাও ছিল বিরক্ত। তার মাঝেই মার্চের মাঝামাঝিতে আমারা কজন বন্ধুর এই ঘোরাঘুরি। ছুটির অলস দিনগুলোতে প্রকৃতির আরো একটু কাছাকাছি যাওয়া। কড়া দুপুরে গ্রামের কোন ছোট্ট চায়ের দোকানে বাঁশের মাচার উপর বসে থাকা। আর এর সঙ্গে রুক্ষ ধুলো ওড়ানো পাহাড়ি পথ। সময়ের ফ্রেমে নিজেকে না বেধে একটু অগোছালো হয়ে ঘোরাঘুরি করতেই পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে আসা।
ইচ্ছে ছিল,গতানুগতিক কোন পর্যটন কেন্দ্রে নয়, একটু অন্য রকম কোন প্রকৃতিতে নিজেকে আবিষ্কার করার। যেখানে প্রকৃতি মনের জানালা খুলে ভাবার জন্য আমাকে এক টুকরো শান্তি এনে দেবে। তার খোঁজেই আমরা এবার হেঁটেছি অজানা পথে- সঙ্গী করে অজানা পথিককে।
খাগড়াছড়ি যার স্থানীয় নাম চেংমাই। এরই বুক চিরে রয়েছে চেঙ্গী নদী। নদীর বয়স কত, তার কোন ইতিহাস জানা নেই। তবে এই শহরেরই মাটিরাঙা উপজেলাতে রয়েছে বয়োবৃদ্ধ এক বট বৃক্ষ। এর বয়স স্থানীয়রা বলে একশ’র বেশি। তবে এই গাছের সৌন্দর্য মনে করিয়ে দেয়,নব যৌবনা ক্ষরতা চেঙ্গীর কথাই। এবারের ঘোরাঘুরিতে এই শতায়ূ বটই ছিল আমাদের লক্ষ্য।এর সঙ্গে খাগড়াছড়ির আর সব সৌন্দর্য্যকে অবশ্য আমরা অবহেলা করিনি। বিখ্যাত আলুটিলা বা স্থানীয়রা যার নাম দিয়েছেন দেবতার গুহা তাও ছিল আমাদের ঘোরাঘুরির তালিকায়। আমাদের দলের কেউ কেউ আবার প্রথমবারের মতো খাগড়াছড়ি আসায় তাদের আগ্রহ আজব গুহার প্রতিই ছিল বেশি। সেই গুহার বর্ণনা না হয় অন্য সময় দেয়া যাবে। তবে শতায়ু বট দেখতে যাবার সময় চাইলেই এই দেবতার গুহা হয়ে যাওয়া যায়। আরগুহা ভ্রমণ শেষে খুব সহজেই বাসে চেপে চলে যেতে পারেন দশ মাইল নামের গ্রামে।
খাগড়াছড়ি শহর থেকে উত্তর পশ্চিমে মাটিরাঙা উপজেলা থেকে একটু আগেই দশ মাইল নামের এক গ্রাম। শহর থেকে দূরত্ত্ব হবে ১৩ কিলোমিটার। একটা লোকাল বাসে চেপে পৌঁছে গেলাম । কিন্তু এরপর
হাঁটা পথ। পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে এই শতায়ূ বট এখনো খুব বেশি পরিচিত নয়। তাই ব্যক্তিগত গাড়ি না নিয়ে আসলে নির্ভর করতে হবে দু পায়ের উপর। আবার ভাগ্য ভাল থাকলে আপনি স্থানীয়দের সাহায্যে মটরসাইকেল বা সাইকেল জোগাড় করতে পারেন। তার জন্যও অপেক্ষা করতে হবে অনেকটা সময়। মটরসাইকেলে যাওয়া আসার ভাড়া পড়বে ১০০টাকা। আর যদি পায়ের উপর নির্ভর করে রওনা দেন তবে বোতল ভরে পানি নিয়েন । কারন পথে কোন চাপকল বা টিউবওয়েল নজরে পড়েনি আমাদের। খোঁজ নিয়ে জেনেছি স্থানীয়রা ঝিরির পানি খেয়ে থাকেন।
কি দেখতে যাচ্ছি ঠিক জানিনা। শুধু জেনেছি একটি বট গাছ। যাদুই একর জমির উপর। একটি গাছেরই রয়েছে দশের অধিক শাখা গাছ। এবার হাটা পথের বর্ণনাতে আসা যাক। অনেক যারা
ঘুরেছেন- রাঙামাটি , বান্দরবান অথবা দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে প্রতিবেশি কোন দেশের শিলং বা দার্জেলিং । তাদের কে বলছি। তুলনা করলে এই হাটা পথটুকু হয়তো শুরুতেই প্রতিযোগীতা থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু যদি চিত্রটা হয় এমন, হাটা পথের অনেক দূরে দূরে পাহাড়ি বাড়ি, আদিবাসী কোন ছোট শিশুর অবাক চাহনি। অথবা খুব সাদামাটা সাদা রঙ্গের কোন পাহাড়ি ফুলের এলাকা দখলের
ছবি । যেনো কেউ ইচ্ছে করেই বিয়ে বাড়ির ঢঙ্গে পুরো এলাকাটি এই ফুল দিয়ে সাজিয়েছে। আর পাহাড়ের মাঝে মাঝে ছোট ছোট জলাধার । তবে সত্যিই তা তুলনাহীন। এমনই এক অবাক করা
সুন্দরের মাঝে আমরা গিয়েছিলাম তিন কিলোমিটার। দূরে ভেসে আসছিল মন্দিরের ধ্বনি। আবার পাহাড়ের মাঝে কবরাস্থানও ছিল। তবে পথ যত পাড়ি দিচ্ছিলাম মানুষের দেখা ততোই কমছিল। মানুষের এই নিরবতা কিন্তু প্রকৃতির জন্য কাল হয়ে দাড়িয়েছে এখানে। কারন হঠাৎই নিরবতা ভেঙ্গে পথের মাঝেই দেখা মেলে ট্রাকটর বোঝাই গাছের গুড়ি। নেই কোন বারন। নেই কোন তদারকি। পাহাড়ি বা এলাকার জোদদার সকলেই কাটছেন গাছ। বিষয়টি নিয়ে উপজেলার এক মেম্বারের সঙ্গে কথা হয় আমার। সেও তার অপারগতার কথা জানায় অকোপটে। এরপর একটা উচু পাহাড় ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠতেই চোখে পড়লো এক টুকরো বড় সবুজ মেঘ। যার পরতে পরতে রয়েছে আলোর ঝিলিক। বুঝলাম আমাদের গন্তব্য এইখানেই। শুকনো পাতা উড়িয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানালো এই শতায়ু বৃক্ষ। সেই সঙ্গে শোনালো কচি সবুজ পাতায় বাতাসের বাঁশি। সুনসান এলাকায় দূরে এক স্কুল ঘর। তার পাশেই এই গাছের আবাস। পুরোন এই গাছের সঙ্গে শুরু হলো আমাদের ভাব বিনিময়।
এমনিতেই পথ পাড়ি দেবার ক্লান্তি ছিল আমাদের মাঝে। তার উপর এমন রাজকিয় সম্ভাষণ।লোভ সামলাতে না পারায় গাছের নীচে মানুষের তৈরি কংক্রিটের বেঞ্চির উপর শুয়ে পড়লাম কয়জন। চোখের উপর তখন কেবলই সবুজ আকাশ। প্রায় ৫০ ফিটের ও বেশি উচু এই বট গাছের ছাদটা প্রাকৃতিক ভাবেই এমন করে তৈরি যে দেখে মনে হবে, এটি একটি বিশাল তাবু। এরমধ্যেই একটা মটরবাইক এসে হাজির । পরিচয় পাওয়া গেলো তিনি এলাকার কমিশনার। জানালেন দুই একরেরও বেশি স্থান নিয়ে ছড়িয়ে আছে এই বট গাছ। চল্লিশ উর্ধ্বো এই ব্যক্তি আমাকে বললেন তিনি তার জন্ম থেকেই এই রকম দেখছেন এই গাছটিকে। তার বাবাও দেখেছেন এমনই। বয়স শুনে বোঝা গেল ইতিহাসের এক বড় সাক্ষি এই গাছ। প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ, ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম কিম্বা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ কোনটাই এড়ায়নি এর নজর থেকে। সময়ের সাক্ষি এই বট স্থানীয় সকলের কাছেই একটি পবিত্র স্থান।
শতায়ূ এই বট গাছের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ডাল পালা থেকে যে সব লম্বা সূড় বা শিকড় বের হয়েছে তা বয়সের ভারে এখন নিজেরাই এক একটি পূর্ণাঙ্গ বট গাছ। এমনই দশের অধিক গাছ রয়েছে
এখানে। হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে, প্রায় শ’খানেক পিলারের উপর দাড়িয়ে আছেসবুজ শান্ত এক টুকরো আকাশ। আমাদের ভ্রমণ কাল ফাল্গুণ মাস হওয়ায় গাছের পাতাও ছিল কচি। আর সেখানে বাতাস আর দুপুরের পর হেলে পড়া সূর্যের ঝিকিমিকি আলো এক মোহময় পরিবেশ তৈরি করলো। যেকোন প্রকৃতি প্রেমী এখানে একবার এলে যাবার বেলায় আর একটু সময় থেকে যাবার কথা ভাববেন। এখানে বসে ঢাকা শহরের যানজট আর ধুলোয় ভরা নগরীকে সত্যিই অবাস্তব বলে মনে হবে।
এবার আসা যাক থাকার প্রশ্নে। সকাল থেকে সন্ধ্যার ঘন্টা দু’য়েক আগ পর্যন্ত এখানে থাকতে কোন বাধা নেই। দু’ঘন্টা বলছি এই কারনে যে এরপর শহরে পৌছানোর জন্য হাঁটা শুরু করতে হবে। এখানে রাত কাটানোর জন্য খোলা আকাশ ছাড়া আর কোন ব্যবস্থা নেই। আর খাবার প্রশ্নে উত্তরটা হবে এমন যে নিজের উপর নির্ভর করুন। অর্থ্যাৎ সাথে করে যা নিয়ে যাবেন তাই খাবেন। তবে খাগড়াছড়ি শহরে থাকতে পারেন। খাগড়াছড়িতে পর্যটনের মোটেল রয়েছে। শহরে ঢোকার মুখে এই মোটেলে শহুরে আর স্থানীয় সব ধরনের খাবারই খেতে পারবেন। থাকার জন্য ঢাকা থেকে যোগাযোগ করে যাবেন। এছাড়া আলুটির উল্টো দিকেও রয়েছে আরো একটি হোটেল। যেখানে থাকা এবং খাওয়া দুটোই সম্ভব। শুক্র-শনিবার বাদ দিয়ে গেলে আগে থেকে যোগাযোগ করে যাবার দরকার নেই। আর খাগড়াছড়িশহরে তো রয়েছে বেশ কিছু ভাল হোটেল। তবে এইসব হোটেলে ওঠার সময় একটু দামাদামি
করে নেয়াই ভাল। ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি যাবার জন্য রয়েছে অনেকগুলো নিয়মিত বাস সার্ভিস।
রাজধানীর পান্থপথ শ্যামলী অথবা কমলাপুর থেকে প্রতিদিন দিনে আর রাতে এই বাস ছাড়ে।
রাতের বাসগুলো ১১ থেকে ১২ টার মধ্যে ছেড়ে যায়। খাগড়াছড়ি থেকে ফেরার সময় কিন্তু
দুপুর দুই টার পর কোন বাস নেই।


ঝুমুর বারী

সাংবাদিক
বিভাগ: ৭১ জার্নাল    দেখা হয়েছে ৪৫৫৮ বার.

 

শেয়ার করুন :

 
মন্তব্য :