ব্রেকিং নিউজ:
ইউরোজোনের অর্থনৈতিক সঙ্কট
- রাজীব সাহা    জুন ২৯, ২০১২, শুক্রবার,     ০৫:৩৪:৩৭

 

গোটা ইউরোপে একক মুদ্রা ব্যবস্থা দিয়ে চলছে ১২ বছর। ইউরো মুদ্রা চালু হবার পর থেকে, এই মুদ্রার মান ডলারকে ছাড়িয়ে যায়। যা ছিল বিশ্ববাসীর কাছে চোখে পড়ার মত। কিন্তু সময় গড়ানো সাথে সাথে পুরো ইউরোজোনের চেহারা বদলাতে থাকে। এই বদলে যাওয়া অবয়বটাই আমরা দেখার চেষ্টা করব।
একটু শুরু থেকে আসি, জার্মানি, ফ্রান্স স্পেন, ইটালী সহ ২০০০ সালে ১২ টি দেশ নিয়ে গঠিত হয় ইউরোপের একক মুদ্রা ইউরো। পরে ইউরোপের আরো ৫ টি দেশ ইউরোর অংশীদার হয়। ইউরো মুদ্রা বিগত দশকের প্রথম দিকে বিশ্ব অর্থনীতিকে খুব দাপোটের সাথে মোকাবেলা করেছে।
ইউরোপিয়ো ইউনিয়ন(ই ইউ) ২৭ টি দেশ নিয়ে গঠিত হলেও ইউরো অন্তরভূক্ত সবাই একক আর্থিক নীতি অনুসরণ করে। ই ইউ-র গঠিত ইউরোপিয়ো সেন্টাল ব্যাংক ইউরোজোনের ব্যাংক গুলোকে সঙ্কটে পড়লে ঋণসহ আর্থিক সহয়তা করে থাকে। এই ব্যাংকের দ্বারা একটা আর্থিক তহবিল তৈরি আছে, ইউরোজোনের দেশ গুলো সঙ্কটে পড়বে তাদের সহয়তা করবে। এমনটাই বলা আছে ই ইউ নীতিমালাতে। সার্বিক ভাবে সব দেশের অর্থনীতির খোঁজ খবর রাখা। সঙ্কট উত্তরণে ইউরোপিয়ো সেন্ট্রাল ব্যাংকতো আছেই।
তাহলে সঙ্কটে পড়লে ইউরো কাছে চাইলেই, অর্থ পাওয়া যাবে। এমনই একটা অবস্থা তৈরি হয়েছিল গোটা ইউরোপে। বড় অর্থনীতির দেশ গুলো সাথে মাঝারি আকারের অর্থনীতি দেশও ইউরোতে আছে। ২০০০ সালে ইউরোজোন গঠিত পর ২০০৪ সালে গ্রীসে অলেম্পিক আয়োজন জন্য কাজ শুরু করে। এই বিশাল অংকের টাকার কাজে গ্রীসের টাকা জোগার করতে ইউরোজোনের তহবিল ও আন্তজার্তিক মুদ্রা তহবিল (আই এম এফ) থেকে অনেক টাকা ঋণ করে। এই ঋণ গ্রীসের জন্য পরে কাল হয়ে দাঁড়ায়। এই ঋণ ও দেশটির বাজেটের ঘাটতি পূরণে ইউরোজোনের কাছ থেকে আরো ঋণ করে। ঋণের বোঝা চাপতে চাপতে তা পাহাড় সমান হয়ে পরে। ঋণ বেশি করার কারণে মুদ্রা বা টাকার মান নেমে যায়। মানে মুদ্রাস্ফিতি বাড়তে থাকে। খাদ্য দ্রব্য ও ঔষদের দাম দ্বিগুন-তিন গুণ হয়ে যায়। একই সাথে ব্যাংক গুলোতে নগদ টাকার চরম সঙ্কট শুরু হয়ে পরে।
গ্রীসকে এই আর্থিক সঙ্কট থেকে বের করে আনার জন্য ইউরোজোনের অন্যান্য দেশ গুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। গ্রীসের অর্থনীতিকে উদ্ধারে ইউরোজোনের সব দেশের মতামতের উপর নির্ভর করে আর্থিক সহয়তা প্যাকেজ ‘বেলআউট’ এর মাধ্যমে টাকা দেওয়া হয়। একই সাথে ইউরোপিয়ো ইউনিয়নের কিছু শর্ত মেনে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘ব্যয় সংকোচন নীতি’। এই মূল কথায় হচ্ছে সরকারী খরচ কমাতে হবে। সরকার বাজেটে যে সব খাতে ভর্তুকি দেয়, সেই খাতে ভর্তুকির টাকা বন্ধ করা। সরকারী কর্মচারীদের চাকুরী থেকে ছাটাই করা। আর বয়স্ক সরকারী চাকুরীজীবীর আরো অবসরের সময় সীমা বাড়িয়ে দেয়। এতে দেশের তরুণদের চাকুরীর সুযোগ থাকে না। দেশে বেকারত্ব অনেক বেড়ে যায়। তাহলে দুই ধরণের বেকার মানুষ হলো, যারা চাকুরী হরালো আর যারা নতুন চাকুরী পেত তারা আর চাকুরী পাচ্ছে না। এই মানুষ গুলো ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পেল। যারা চাকুরী করে তাদের উপর সরকার আরো কর বাড়িয়ে সরকারী আয় বাড়ানো চেষ্টা করলো। এভাবে চলতে থাকায় গ্রীসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে এগিয়ে গেল। ঋণের টাকার পরিমাণ এতোই দাড়ালো যে, এই ঋণ ফেরত দেয়ার মত অবস্থা হারালো গ্রীস। গ্রীসকে বাঁচাতে ইউরোজোনের অন্যান্য দেশ গুলো টাকা দিলো ইউরোপিয়ো সেন্ট্রাল ব্যাংকের তহবিলে। ঐ টাকা দিয়ে গ্রীসকে সাময়িক রক্ষা করা গেলেও পরবর্তীতে দেশটি ঋণের টাকা ফেরেত দিতে ব্যার্থ হল।
ইউরোপিয়ো সেন্ট্রাল ব্যাংকের টাকাতো ইউরোজোনের সবার ছিল। আস্তে আস্তে ইউরোজোনের মাঝারি আকারের অর্থনীতির দেশ গুলো একটু একটু করে আর্থিক সঙ্কটে পড়তে থাকে। কারণ ইউরোজোনের অন্যান্য দেশ গুলো টাকা ইউরোপিয়ো সেন্ট্রাল ব্যাংকের তহবিল থেকে ফেরত পেল না। একারণে প্রত্যেক দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংকের রির্জাভ টাকার সঙ্কটে পরে। এই সঙ্কট কাটাতে কাটাতে হিমসিম খেতে হয়েছে ইউরোজোনের দেশ গুলোর।
তবে কোন কোন দেশ সাময়িক ভাবে সামাল দিলেও পরে নগদ টাকার সঙ্কটে পরে। এর আরেকটি কারণ ছিল ইউরোজোনের একক আর্থিক নীতিমালা। কারণ প্রত্যেক দেশকে ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দার শুরুর পর থেকে গোটা ইউরোপের অর্থনীতির নানান সঙ্কটে পরে। ইউরোজোনের দেশ গুলোর রপ্তানি কমে যায়। উৎপাদনমুখী বহুজার্তিক কোম্পানি গুলোর রপ্তানি ব্যাপক হারে কমে আসে। এই কোম্পানি গুলো দেউলিয়া হতে থাকে। একই সাথে পুরো ইউরোপের শেয়ারবাজারে দরপতন চলতে থাকে।
এক পর্যায়ে পর্তুগাল, স্পেন, সাইপ্রাস, আয়ারল্যান্ড এই দেশ গুলো সাম্প্রতিক সময়ে সঙ্কটে পরে। ২০১২ সালের মে মাসে স্পেনের বানিজ্যিক ব্যাংক গুলোর চরম নগদ টাকার সঙ্কটে পরে, এরই মধ্যে তিনটি বানিজ্যিক একত্রিত হবার সিদ্ধান্ত নেয়। তিন ব্যাংকের তারল্য এক করে ঐ তহবিল দিয়ে নতুন ব্যাংক নামে কাজ শুরু করে। স্পেনের সেন্ট্রাল ব্যাংকের রির্জাভ কমে আসে। স্পেন জুড়ে আলোচনার ঝড় উঠে ইউরোজোনের তহবিল থেকে ‘বেলআউট’ প্যাকেজ নিবে কিনা। ঐ মহুতেই স্পেন ব্যাংক গুলোর ৮০ বিলিয়ন ইউরো দরকার। সরকারের মধ্যে এই বেলআউট প্যাকেজ নেওয়া ক্ষেত্রে দ্বিমত দেখা দেয়। এর পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা টেলিফোনে জার্মান চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মেরকেলের সাথে ইউরো সঙ্কট নিয়ে কথা বলে। নতুন পরিকল্পানার নিয়ে কার্যকর পদক্ষপে মাধ্যমে অর্থনৈতিক সঙ্কট নিরসনে কাজ করার আহবান জানান ওবামা। আই এম এফ ইউরোজোনের সঙ্কট নিরসনে উদ্ধার প্যাকেজ নেওয়া কথা বলে। ঐ সময় ব্রাসেলসে ইউরাজোনের অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে স্পেনকে ঋণ নেওয়ার পক্ষে মত দেন। এই ঘটনার পর স্পেন ইউরো তহবিল থেকে ১০০ বিলিয়ন ইউরো ঋণ হিসেবে নেওয়ার ঘোষনা দেয়।
সাইপ্রাসও একই সমস্যায় রয়েছে। সরকারী ব্যয় বেড়ে যাওয়াও ব্যাংক থেকে ঋণ করায় সাইপ্রাসও ইউরো তহবিল থেকে ঋণ করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আয়ারল্যান্ডে ভোট হচ্ছে ইউরোজোনের ফিসকাল নীতিমালায় দেশটি থাকবে কিনা। আয়ারল্যান্ডের ৬০ ভাগ জনগন অবশ্য ইউরোজোনে থাকার পক্ষে মত দিয়েছে। এখন আয়ারল্যান্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে দেশটির অর্থনীতির কি হয়। তবে তাদেরও ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহন করতে হবে।
পর্তুগালও চিকন সুতার উপর দিয়ে হাঁটছে। যে কোন মহুর্তে ঋণের খাদে পরে যেতে পারে। গোটা ইউরোপে এই ঋণ সঙ্কট এখন চরমে। ইউরোপে ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ এখন বেকার সমস্যায় রয়েছে। শুধু স্পেনেই বেকারত্বের হার ২৪ শতাংশ। এত সঙ্কটের মধ্যে ইউরোপের বড় অর্থনীতির দেশ জার্মানি ও ফান্স শেষ পর্যন্ত ইউরোজোনকে কিভাবে রক্ষা করে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ গোটা ইউরোপে আবাসন খাতে ব্যাপক ঋণ দিয়েছে বানিজ্যিক গুলো। এই ঋণ গুলো বেশির ভাগই কুঋণে পরিণত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জার্মান চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মেরকেল বলতে বাধ্য হয়েছে, স্পেনে আবাসন খাতে খারাপ বা কুঋণ দেওয়া জন্য বর্তমানে এখন ব্যাংক গুলোতে নগদ টাকার সঙ্কট। কারণ ঋণ করা মানুষ গুলো এখন ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।
গ্রীসের অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়ে এখন ইউরোজোনের আরো অনেক দেশ ঋণ সঙ্কটে পড়েছে। ঋণ সঙ্কট থেকে পুরো অর্থনীতির চাপ তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে সাধারণ মানুষের উপর কর বাড়ানো, সরকারী ব্যয় সংকোচন করা মাধ্যমে ঋণ বোঝা থেকে আর বের হতে পারছে না ইউরোজোনের মাঝারি আকারের অর্থনীতির দেশ গুলো।
“এই লেখাটি একজন নবীন সাংবাদিক হিসেবে। আমি এখানে কোন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে না। আমি বিশ্ব গণমাধ্যাম পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে, আমার ছোট জানার পরিধি থেকে এই লেখা”।
এম. এস.
বিভাগ: শীর্ষ সংবাদ.   দেখা হয়েছে ১২০২ বার.

 

শেয়ার করুন :

 
মন্তব্য :