ব্রেকিং নিউজ:
সাগরতলে ধুকঁছে প্রবাল
হোসেন সোহেল    ফেব্রুয়ারী ১৪, ২০১২, মঙ্গলবার,     ০৯:৫৪:০৬

 

ঝকঝকে পানির ওপরটা আর ত্রিশ ফুট নীচের জগত পুরোটাই আলাদা। সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত বড় আকারের পাঁচটি জাহাজে প্রতিদিন প্রায় হাজারখানেক পর্যটক আসে সেন্টমার্টিন্স দ্বীপে। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সাগরতলের একমাত্র পর্যটক আতিক রহমান এবং প্রাণিবিদ ডক্টর আনিসুজ্জামান খান'কে সাথে নিয়ে একাত্তর টিভির প্রকৃতি পর্যবেক্ষক দল ডুব দিলাম সাগরতলে । হাতে থাকলো পানি প্রতিরোধক ক্যামেরা। স্কুবা ডাইভার আতিক রহমান শত কিলোমিটার ঘুরে দেখেছেন সেন্টমার্টিন্সের সাগরতল। তার পরামর্শে সাতটি পয়েন্ট বেছে নিলাম। নতুন কিছু দেখবো বলে।
পানির ত্রিশ ফুট নীচে আমরা। গা-শিউরে ওঠা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। পানির নিচে নামায় মাঝে মধ্যেই ব্যাথায় টনটন করছে কান। এরকম অবস্থার ভেতরেও আতিক রহমানের উপদেশ ষোল আনা মানতে হচ্ছে। পানির তলায় ডুবে-চলার কিছুক্ষণ পর চোখে পড়লো টিনের কৌটো, পলিথিনের স্তুপ আর ক্যারেন্ট জালের টুকরো। যা প্রবালের গা জড়িয়ে আছে। স্তরে স্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেসব আর্বজনা। এসব আবর্জনার ভাগাড়ে প্রবালদের ওষ্ঠাগত প্রাণ। বেঁচে থাকার লড়াই। এমন দৃশ্যে জায়গা পরিবর্তন করলাম আমরা।
পানির গভীরে একে অন্যের হাতে হাত রেখে তলায় ডুবে যাচ্ছি। অন্যরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে চলেছি আমরা। দেখা মিলবে রূপকথার জগত। আমাদের প্রত্যাশা। মাঝে মাঝে অক্সিজেনসহ শরীরের সব যন্ত্রপাতি ঠিক আছে কিনা পানির নীচেই তা পরীক্ষা করে দেখছেন স্কুবা ডাইভার আতিক রহমান। ততক্ষনে আমরা পানির বিশ ফুট নীচে। ঝলমলে রোদের আলো তখন তির্যক ভাবে উঁকি দিচ্ছে সাগরতলে। রোদের আলোতে সবকিছুই রঙ্গিন। রঙ্গিন মাছ, স্করপিয়ন, লায়ন ফিশ, ইল ফিশসহ আরও কিছু রঙ্গিন প্রাণির ছবি তুলতে ব্যস্ত আমাদের একজন।
কিন্তু সারগতলে একি দেখছি ? জাহাজের বড় প্রপেলার প্রতিদিন সেন্টমার্টিন্সের জেটির কাছে এসে মূহুর্তেই সাগরতলকে উলট-পালট করে দেয়। স্বচ্ছ পানি নিমিষেই ঘোলা হয়ে যায়। দিনের পর দিন সেসব ধুলা-বালি জমা হয় প্রবালের উপর। মোটা আস্তরনের চাপে প্রবাল হারায় জীবন। একটি জাহাজের আসার শব্দ টের পেয়ে আমরা তলদেশ থেকে উপরে উঠে এলাম, বলা ভালো আসতে বাধ্য হলাম। আবার অন্য গন্তব্য।
সেন্টমার্টিন্স দ্বীপ উত্তর-দক্ষিণ লম্বা। অনেকটা ডাম্বেল আকৃতির। প্রধান দুটি অংশ উত্তর পাড়া ও দক্ষিণ পাড়া। মাঝে সরু অংশের নাম গলাচিপা। দক্ষিণে ছেঁড়াদিয়া (দিয়া মানে দ্বীপ) জোয়ারের সময় মূল দ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনটি সরু দ্বীপের রূপ নেয়। দ্বীপের উত্তর পূর্ব অংশ ছাড়া তীরবর্তী পুরো এলাকা জুড়ে মৃত প্রবাল ছড়ানো ছিটানো।
এবার আমরা দক্ষিণে ডুব দিলাম। ছেড়াদ্বীপ থেকে প্রায় সাত'শ গজ দক্ষিণে। এবার পানির তলায় নামার গতি আরো বেশি। উত্তর (জেটির পানি) থেকে দক্ষিণের পানি আরও স্বচ্ছ। এখানে ২৫ ফুট নিচেই তলার দেখা মিললো। এ কি ? নিজের চোখে বিশ্বাস হচ্ছে না। পুরো এলাকা জুড়ে প্রায় সমস্ত প্রবাল উল্টো হয়ে কেন? কেন ওদের এমন মৃত্যু? প্রবাল কোন পাথর নয়, প্রবালরা জীবন্ত সত্তা- তাদেরও রয়েছে অনুভুতি, যে অনুভূতিকে প্রতিনিয়তই স্তব্ধ করে দেয় সেন্টমার্টিন্সের প্রায় হাজারো ট্রলার ও স্পীড বোট। প্রতিটি ট্রলার নোঙ্গর করে জীবন্ত প্রবালের উপর। নোঙ্গর উঠানোর সময় প্রবালগুলো হয় ক্ষত-বিক্ষত, হয়ে যায় উলট-পালট। সাগরতলের প্রবালকে ভালেবেসে বলা হয় আতুঁড়ঘর। কারণ, হাজারো জলজ প্রাণের জন্ম হয় প্রবালকে ঘিরে। মনভারি'র সময় দলছুট রঙ্গিন মাছেরা আমাদের কাছে দৌড়ে আসছে-যাচ্ছে। আমাদের ভিডিও ক্যামেরা অন।
পানির তলায় বুদ-বুদ ছাড়তে ছাড়তে এবার ডক্টর আনিস ইশারায় কিছু বুঝাতে চাইলেন। হলুদ, কমলা, খয়েরি, সবুজ রঙের বেঁচে থাকা কিছু প্রবাল দেখিয়ে কিছু জানাতেও চাইলেন। আমি বা আতিক রহমান কেউই বুঝলাম না। কি বলতে চান আনিস ভাই ?
উঠে পড়লাম আমরা। আনিস ভাই বললেন সেন্টমার্টিন্সের প্রবাল ভয়ংকর রোগে আক্রান্ত। রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সাগরতলের প্রবাল জগতে। কি সর্বনাশা তথ্য! তিনি বললেন 'প্রবাল ব্লিচ' এর কথা। প্রবাল সাদা বর্ণে রুপান্তরিত হতে চলেছে বড় এলাকা জুড়ে। প্রবালের কোষে এককোষী শৈবাল বাস করে। এর অর্থ তারা একত্রে একটি জীবের মত বাস করে। শৈবাল সূর্যালোকের সাহায্যে ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়ায় প্রবালের দেহে রঙের জন্ম দেয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রবালে শক্তি জড়ো হয়ে স্বাস্থ্যকর প্রবাল তৈরী হয়। পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে শৈবাল প্রবালের কোষ হতে বিচূত হয়ে যায়, এর ফলে ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়া ব্যহত হয় এবং প্রবাল বর্ণহীন হয়ে ক্ষয় হয়ে যায়।
এমন সাদা ছোপ ছোপ চিতি পড়া প্রবাল আমাদের চোখে পড়তে লাগলো সাগরতলের অনেক এলাকাতে। স্থান পরিবর্তন করে আমরা সাতটি পয়েন্টে ডুব দেই। সব জায়গায় প্রায় এক অবস্থা। এখন আর তেমন বর্নিল কোন মাছ চোখে আসছে না। সেই সাথে নেই কোন সজীব প্রবাল। আমাদের প্রত্যাশাও ম্লান হয়ে আসছে। প্রবালের সত্যিকার রঙ কে যেনো ছিনিয়ে নিয়েছে। এ কেমন প্রবাল? মৃতপ্রায় অসংখ্য প্রবালের সাদা খোলস সারি সারি করে পড়ে আছে সাগরতলে। আনিস বললেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সাগরতলের তাপমাত্রা উঠা-নামা ও সেই সাথে বড় জাহাজের অনিয়ন্ত্রিত আনাগোনার কারণেই এসব হচ্ছে। তাছাড়া হাজারো ট্রলার অনিয়ন্ত্রিতভাবে জীবন্ত প্রবালের উপর নোঙ্গর ফেলে প্রবাল ধ্বংস করছে ও সেই সাথে প্রবালের ওপর আর্বজনা ফেলার কারণে প্রবালরা মরতে বসেছে। আমরা শংকিত হলেও একাত্তর টিভির ক্যামেরায় উঠে আসে রোগে-শোকে ধুকঁতে থাকা প্রবাল জীবনের আত্নকথা।
সেন্টমার্টিন্সের উপরিভাগের জীববৈচিত্র্যসহ প্রায় সবকিছুর গবেষনা একাধিকবার করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। অথচ সেন্টমার্টিন্সের পানির তলে এমন ভয়াভবহ একটি রোগের কথা তাদের অজানা। প্রবালকে টিকিয়ে রাখার বিষয়টি মাথায় রেখেই সেন্টমার্টিন্সকে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন (ইসিএ) হিসেবে ঘোষনা দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। দুঃখজনক হলেও সত্যি বাস্তবে তা সংরক্ষণের কোন কার্যকার চেষ্টা নেই। প্রাণিবিদরা বলছেন, এভাবে প্রবালদের অপমৃত্যু না ঠেকাতে পারলে, তাদের সুস্থ্যভাবে বাঁচার পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে, আগামীতে প্রবালশূণ্য হবে পড়বে প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন্স।

এম. এস./১৪.২৫
বিভাগ: প্রাণ প্রকৃতি   দেখা হয়েছে ৫১০৪ বার.

 

শেয়ার করুন :

 
মন্তব্য :