প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে ২৫ বছর পর কোনো নদীর পানি বণ্টনে একমত হতে পেরেছে দুই দেশ। ফলে দেশের উত্তরপূর্ব সীমান্তে সংঘাত বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।
শনিবার এডিটর্স গিল্ড আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এখন প্রমাণিত। তাই ভারতের ব্যবসায়ীরা এদেশে বিনিয়োগে সর্বোচ্চ আগ্রহ দেখিয়েছে।
এবার প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে সাতটি সমঝোতা স্মারক, ছয়টি প্রকল্প অবহিতকরণ এবং ৩৩ দফা যৌথ ইস্তেহার ঘোষণা করা হয়। আলোচনায় ভারতীয় সাংবাদিকরা বলেন, বাংলাদেশের সক্ষমতা এখন বিশ্ব দরবারে সমাদৃত। তাই চাওয়া পাওয়ার হিসাব ভিন্নভাবে করতে হবে।
টেলিগ্রাফের সাংবাদিক দেবদীপ পুরোহিত বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে লোক নানা কথা বলবে। আমি মনে করি বাংলাদেশ-ভারত প্রতিবেশী। এখানে সম্পর্কের অনেক ডায়নামিক্স আছে। কিছু ভালো হবে কিছু খারাপ হবে। তবে ফোকাসটা যাতে আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। এটা একটা সম্পর্কের স্পিরিট হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে ডায়নামিক্সটা এমন হয়ে গেছে যে প্রথম প্রশ্নই আসে– বাংলাদেশ কী পেলো? আমি ২০১১ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক কাভার করছি। আমার কাছে এবারের সফর খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে এবং অত্যন্ত ইতিবাচক মনে হয়েছে।
ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক অগ্নি রায় বলেন, আগে একসময় আমরা দূতাবাসের ঠিকানাই জানতাম না, যাওয়া হতো না। একমাত্র দুদেশের সীমান্তরক্ষীর মিটিং হলে তখন প্রেস কনফারেন্সের একটি কাগজ দিয়ে দিতো।
তিনি বলেন, আর এখন দূতাবাসে গিয়ে চা খেতে খেতে ভিসা হয়ে গেলো, চলে এলাম। এটা কী বুঝিয়ে দেয় না যে সম্পর্ক কতটা বদলে গেছে। সুতরাং ওই যে ‘চাওয়া পাওয়া’ এর মধ্যে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক যদি ফ্রেম করে রাখি তাহলে মনে হয় একটু অবিচার করা হয়ে যাবে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর মহুয়া চট্টোপাধ্যায় বলেন, দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের দুই মাস আগেও আমরা ঢাকায় একরকম তোরজোড় দেখেছি। আমরা যারা বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক কাভার করি, তাদের মধ্যেও কিন্তু একটা প্রস্তুতি ছিলো। এই তিন বছরের গ্যাপে ট্রেড, ইকোনমি ছাড়াও রাজনৈতিক অনেক ঘটনা ঘটে গেছে।
আলোচনায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আমেনা মহসিন বলেন, ফরেন পলিসি একটা প্রসেস ওরিয়েন্টেড বিষয়। সেই জায়গা থেকে বললে আমরা সঠিক পথে আছি। এখানে এত চিন্তা ভাবনার সুযোগ নেই। আমার কাছে এই সফরের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক মনে হয়েছে কানেক্টিভিটির জায়গা। এই জায়গা ভীষণভাবে ফোকাসড ছিল।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ বলেন, ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন অনেক পরিণত। যিনি বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে জাতীয় স্বার্থ নিয়ে আমি যদি এগিয়ে যাই তাহলে আমার দেশ এবং বন্ধু—সবাই উপকৃত হয়।
তিনি আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যখন এই আস্থা নিশ্চিত হয়ে যায় যে ভারত আছে আমার চারপাশে আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত, আমরা আছি ভারতের পেটের ভেতরে। আমাদের দিক থেকে ভারতের নিরাপত্তা শঙ্কা নেই।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রতিবেশী কূটনীতির রোল মডেলে আমরা পৌঁছাইনি, তবে সে পথে হাঁটছি। আমাকে যদি বলা হয় রোল মডেল কোথায়, আমি তাহলে বলবো ইউরোপীয় ইউনিয়নে এটা আমি দেখি। সাউথ এশিয়ার কনটেক্সটে অবশ্যই আমরা রোল মডেল, তবে গ্লোবাল প্রেক্ষাপটে আমাদের আরও এগুতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর উপলক্ষে ‘প্রতিবেশী কূটনীতির রোল মডেল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, কুশিয়ারা নদীর পানি চুক্তি হবার কারণে পাম্প বসিয়ে পাঁচ হাজার একরে শীতকালে সেচের সুবিধা হবে।
তিনি জানান, কুশিয়ারা নদীর পানিবণ্টনে ১৫৩ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তে কৃষি ক্ষেত্রে আসবে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সেচের পানির অভাবে বিপর্যস্ত সিলেট অঞ্চলের বেশ কয়েকটি উপজেলার কৃষক এবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, আমার দেখা সফরগুলোর মধ্যে অত্যন্ত সফলতম সফর ছিল এবারের ভারত সফর।
তিনি আরও বলেন, যারা এই সফর হওয়ার আগে এবং পরে অণুবীক্ষণ-দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে, রাজনৈতিক মতাদর্শ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন তাদের কাছে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অভিন্ন সীমান্ত নদী কুশিয়ারা থেকে ১৫৩ কিউসেক পানি প্রত্যাহারে ভারতের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। পানি প্রত্যাহারের ফলে পাঁচ হাজার একর জমি সেচের আওতায় আসবে। শুষ্ক মৌসুমে এসব জমি পানি সংকটে ছিল।
শাহরিয়ার আলম বলেন, এই সফরে ৩৩ দফার একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে সাতটি সমঝোতার উল্লেখ আছে, ছয়টি প্রকল্পের উদ্বোধন কিংবা কন্সট্রাকশন শুরু অথবা কোন পর্যায়ে আছে সেটি দুই জাতিকে অবহিত করা হয়েছে।
এই সফরের প্রেক্ষিতে আমি মনে করি না চাওয়া-পাওয়ার কথা একেবারেই বাদ দিয়ে দিতে হবে। একটি সফরে কেউ কম পাবে, কেউ বেশি পাবে। এখানে বাংলাদেশ অবশ্যই একটি পর্যায়ে এসেছে যেটি সে ডিজার্ভ করে, যোগ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তরা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে আলোচনাকে বড় প্রাপ্তি। তারা বলছেন, দ্রুত ভারত থেকে ডিজেল আমদানি শুরু করতে পারলে কেটে যাবে সংকট।
এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবুর সঞ্চালনায় গোলটেবিল আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত ও দ্য হিন্দু পত্রিকার প্রতিবেদক কল্লোল ভট্টাচার্য।