‘নিজেদের গ্যাস উত্তোলন না করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়ে বিদেশি তেল ও গ্যাস নির্ভরতার কারণেই দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কট হয়েছে। এখানে মুনাফালোভী দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী লবি সরকারকে অসহায় কেরে রেখেছে’।
বিশেষ সাক্ষাৎকারে জুলিয়া আলমকে এসব কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ।
তিনি আরও বলেছেন, ‘দেশের আর্থিক খাত ও অর্থনীতির নীতি প্রণয়নে এখন ঋণ খেলাপি ও লুটেরা শ্রেণিও যুক্ত হয়, যেটি জনবান্ধব রাজনৈতিক অর্থনীতির জন্য খুবই উদ্বেগের’।
জুলিয়া: আপনার পর্যবেক্ষণে দেশের অর্থনীতি এখন আসলেই কেমন আছে?
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতি আলোচনা করতে গেলে বলতে হয় এর বিভিন্ন মাত্রা আছে। অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি আলোচনা করতে গেলে কয়েকটা জিনিস বিশেষ আলোচনার দাবী রাখে। একটা হচ্ছে জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয় যা আমাদের জনগোষ্ঠীর ১০ ভাগের জন্য কোন সমস্যা না বাকী ৯০ ভাগের জন্য বড় সমস্যা। সমস্ত জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয়টা কমে যাচ্ছে। প্রকৃত আয় কমে যাওয়া মানে সে আগে যা ভোগ করতে পারতো, আগে যা কিনতে পারতো, আগে শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য যতটুকু খরচ করতে পারতো এখন সেটা করতে পারবে না। অর্থনীতির আসল মাপকাঠিতে জনগোষ্ঠীর নীচের শতকরা ৫০ ভাগ এর অবস্থা খুব খারাপ। তাদের ন্যূনতম ক্যালরি গ্রহণ এবং ন্যূনতম চিকিৎসা বিপর্যয়ে পড়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাচ্ছে। অসুখ-বিসুখে তাদের চিকিৎসা করার ক্ষমতা নেই যেটা সবচেয়ে বেশী উদ্বেগজনক। আরেক দিক হল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগ আছে। আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে রপ্তানি আয় সে তুলনায় বাড়ছে না। রেমিট্যান্স ফরমাল চ্যানেলে যেভাবে আসছে সরকারের হিসাবের থেকে তার বাইরে চলে যাচ্ছে অনেক বেশী। ফলে রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। রিজার্ভ কমে যাওয়া মানে একটা আতঙ্ক তৈরি হওয়া আর আতঙ্ক তৈরি হলে তো আরো কমে যাওয়ার আশংকা থাকে। তো এ রকম একটা পরিস্থিতির মধ্যেই আমরা আছি।
জুলিয়া: সরকার দাবি করছে অর্থনীতির চলমান সঙ্কটের কারণ পুরোটাই বৈশ্বিক। আপনার পর্যবেক্ষণ কী? আসলে মূল সমস্যা কোথায়?
আনু মুহাম্মদ: বৈশ্বিক যে পরিস্থিতি রুশ-ইউক্রেন-ন্যাটো যুদ্ধ- তবে তা শুধুমাত্র রাশিয়া-ইউক্রেন বলা ঠিক হবে না এর মধ্যে ন্যাটোর শক্তিশালী অবস্থান আছে। ন্যাটো মানেই তো বিশ্বের প্রধান শক্তি এবং ঘটনা দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, যুদ্ধটা অব্যাহত রাখাই তাদের ইচ্ছা। বিশেষত যারা অস্ত্র রপ্তানিকারক- অস্ত্র উৎপাদন করে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তো তারাই আছে আবার তারাই পৃথিবীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। তো সেই রকম একটা পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে এটা ঠিক হবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এই যুদ্ধের প্রভাব তো আছেই।
বিশ্ব অর্থনীতির সাথে আমাদের অর্থনীতির যোগসূত্র আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্য আরেকটা হচ্ছে রেমিট্যান্স আর বিদেশী বিনিয়োগ আর বিদেশী ঋণও আছে। এই তিনটি ক্ষেত্র কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হতে পারে। তবে এখন যে সংকটটা টের পেয়েছি জিনিসপত্রের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায়।
দেশেও তেলের দাম অনেক বাড়ানো হলো। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আকস্মিকভাবে অনেক কমে গেলো। তবে এগুলো যে শুধু যুদ্ধের কারণেই হয়েছে এটা কিন্তু আবার ঠিক না। এগুলো সরকারের জন্য সুবিধাজনক উপলক্ষ- সবকিছু যুদ্ধের ওপর চাপিয়ে দেয়া। অভ্যন্তরীণ কারণগুলোও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আভ্যন্তরীণ কারণগুলোর জন্য যুদ্ধ না হলেও আমরা এই লোডশেডিং দেখতাম, জিনিসপত্র, তেলের দাম ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি দেখতাম আর আইএমএফ নির্ভরশীলতা আর বিভিন্ন শর্তের মধ্যে পরতাম। আভ্যন্তরীণ কারণগুলোর একটা হচ্ছে ব্যাংক। ব্যাংকিং অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ব্যাংক আমানত রাখে ঋণ দেয়, আমদানি-রপ্তানিতে অর্থ সংস্থান করে, বিদেশী ঋণ আনে বিতরণ করে তাই মূলত ব্যাংকই অর্থনীতিটা চালায়। ব্যাংক যদি বড় ধরনের অব্যবস্থাপনায় পড়ে, সেখানে যদি কোনো তদারকি না থাকে, যদি দেখা যায় যে, কিছু গোষ্ঠী ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করছে তাদের দ্রুত টাকা সঞ্চয়ের জন্য। তাহলে তো একটা বড় ধরনের সংকটের জায়গা তৈরি হবেই। ঐটার সাথে তো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্পর্ক নাই। আমরা যে মাত্রায় ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতা দেখছি, যে মাত্রায় ঋণখেলাপি দেখছি, যে মাত্রায় ঋণখেলাপির টাকা পাচার হওয়ার খবর পাচ্ছি। এটা তো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সাথে কোনো সম্পর্ক নাই।
দ্বিতীয়ত এই যে, তেলের দাম বাড়ানো হলো, লোডশেডিং হলো সেটা সরকার বলবে যে, আমাদের কী করার ছিলো? আমাদের গ্যাস নাই। আমাদের গ্যাস আমদানি করতেই হবে। গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে গেলে আমাদের কী করার আছে। কিন্তু গ্যাস আমদানি করতে হলো কেন? সে পথে সরকার কেন গেলো? সেটা একটা বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে বিপুল সম্ভাবনার দু’টি ক্ষেত্র আছে-একটা হলো আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাস, আরেকটা নবায়নযোগ্য জ্বালানী। এই দু’টো জায়গা ঠিক থাকলে কোন সংকটে আমাদের পড়তে হতো না। এখন দেশের ৫০ বছর পার হয়েছে। আমরা উন্নত হচ্ছি এরকম কথাবার্তা শুনি। কিন্তু যদি দেখা যায় যে নীতি প্রণয়নে জাতীয় সক্ষমতার লক্ষণ নাই। ৫০ বছর পার হয়ে গেলো এখনো যদি বলে- আমাদের গ্যাস অনুসন্ধানের উত্তোলনের ক্ষমতা নাই। তারপরে আমরা কী করে দাবি করি যে, আমরা উন্নত হচ্ছি। গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলনের জন্য সক্ষমতা বাড়াতে হবে তা আমরা গত ২০ বছর ধরে বলছি। গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ থাকলে এখনকার এলএনজি বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এই নির্ভরশীলতাটা তৈরি হতো না। এখানে আমি নিশ্চিত যে, গ্যাসের যে সংকটটা রয়ে গেলো, সক্ষমতা বাড়ানো হলো না। সেটা খুবই উদ্দেশ্যমূলক ও পরিকল্পিত। কিন্তু কেন? কারণ, গ্যাস থাকলে তখন কিছু লবিস্ট, কিছু কিছু ব্যবসা র্যাশনালাইজড করা যায়। যারা এলএনজি আমদানির সাথে যুক্ত তাদের লবিং এখানে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে বলে আমার ধারণা। সারা পৃথিবীতে যখন কয়লা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে তখন বাংলাদেশে কয়লার দিকে যাওয়ার যুক্তি দেয়া হয় আমাদের তো গ্যাস সংকট। একটা অদ্ভুত ব্যাপার যারা আজকে গ্যাস সংকটের কথা বলে এলএনজি ও কয়লার যৌক্তিকতা দেখাচ্ছে তারাই একসময় বলতো বাংলাদেশ গ্যাসে ভাসছে সুতরাং গ্যাস রপ্তানি করতে হবে। গ্যাস এর যদি জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করা হতো, তাহলে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ হলে আমাদের কী আসে যায়? আর আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি যদি বলি- সূর্যটা তো আমাদের। সূর্য তো রাশিয়া-ইউক্রেনের না। সেই সৌরশক্তি, সেই বায়ুশক্তি ব্যবহারের যে উদাহরণ আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাই। সেটা যদি আমরা করতে পারতাম তাহলে তো এলএনজির দাম ১০ গুণ বাড়ুক না। তাতে আমাদের কী? কিংবা কয়লার দাম বাড়ুক বা তাদের এই আন্তর্জাতিক বাজারের তাতে আমাদের কিছু আসতো যেতো না। তেলের দাম শুধুমাত্র যে যুদ্ধের জন্য বাড়ে তা নয়। তেলের মার্কেট স্পেকুলেটিভ বহু গোষ্ঠী আছে দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করে। এটা যুদ্ধ ছাড়াও হতে পারতো।
জুলিয়া: দেড় বছর আগে নিজেদের রিজার্ভ থেকে শ্রীলংকাকে ধার দেয়া বাংলাদেশ এখন আইএমএফ-এর ঋণ নিচ্ছে। এই অবস্থা কেন তৈরি হলো? সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাত পরিস্থিতি আপনি কিভাবে দেখছেন?
আনু মুহাম্মদ: দেখেন সমাজের কোন গোষ্ঠীর যদি ইচ্ছা হয় দ্রুত টাকা বানানো এবং তাদের সাথে যদি সরকারের যোগাযোগ থাকে তাহলে আর্থিক খাত এখন তাদের জন্য সুবিধাজনক জায়গা। আপনি এক লক্ষ টাকা লোন চাইতে যান পঞ্চাশ রকম কাগজপত্র চাইবে আর এদেশেই আমরা একের পর এক নিউজ দেখছি যে হাজার হাজার কোটি টাকা কিছু গোষ্ঠী লোন নিচ্ছে, পরিচিত গোষ্ঠী| টাকা দেশে বিনিয়োগও দেখা যাচ্ছে না খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। টাকা কোথায় চলে যাচ্ছে? সরকারের কোনো কার্যকর তদারকি নাই। বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় দায়িত্ব এগুলো মনিটরিং করা। কিন্তু কৃষক কয়েক হাজার টাকা খেলাপি হয়ে জেলে যায় অন্যদিকে শত কোটি টাকা, হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপিরা বাইরে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি প্রণয়ন করছে। তারা বড় ঋণখেলাপিকে সুবিধা দিয়ে ঋণ রি-শিডিউল করছে। বেশী টাকা যাদের তাদের সুবিধাই বেশী। এভাবেই নীতি তৈরি হচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো পরিবারগুলোর হাতে। এমনও ঘটনা দেখলাম- বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সন্ধ্যার পর অফিস টাইমের পরে হোটেলে গিয়ে শিল্পপতিদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এখানে নিশ্চিতভাবেই বোঝা যায়, যে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো কাজ করছে না। যারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কমান্ডে থাকবে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক বরং তাদের অনুসারীতে পরিণত হয়েছে, ঋণখেলাপিদের নির্দেশ পালনকারীতে পরিণত হয়েছে। এটা তো একটা বড় ভয়ের জায়গা। ঋণখেলাপি বা লুণ্ঠনের চিত্রে পরিষ্কার যাদের পাওয়া যাচ্ছে, শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে এমএলএম ব্যবসা –সবকিছুর মধ্যে যাদের বড় ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে তারাই যদি অর্থকরী খাত, নিয়ন্ত্রণ করে, সরকারের নীতিমালা যদি তারাই নির্ধারণ করে তাহলে একটা ভয়াবহ বিপদ আসতেই পারে। আরেকটা দিক হচ্ছে, বৈদেশিক ঋণ। সরকার বৈদেশিক ঋণ নেয়। এখন প্রাইভেট সেক্টরও লংটার্ম শর্ট ও লং টার্ম বৈদেশিক ঋণ নিতে পারে। অবশ্য প্রাইভেট সেক্টর যদি বৈদেশিক ঋণ নেয় সেটার দায়ভারও সরকারের ওপর পড়ে এবং পরিশোধের দায়। আমরা দেখছি গত কয়েক বছরে প্রাইভেট সেক্টর, পাবলিক সেক্টর দু’জায়গাতেই স্বল্পমেয়াদী বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি এবং সেটার দায় শোধের চাপ এখন ক্রমান্বয়ে বাড়বে। অনেকগুলো মেগাপ্রকল্পও ঋণ নির্ভর- কোনটা রাশিয়ান, কোনটা চীনা, কোনটা ভারতীয় বা কোনটা জাপানী ঋণ। এই প্রকল্পগুলোতে অনেক ছাড়ও দেয়া হচ্ছে। তাদের মালামাল আমদানিতে শুল্ক দিতে হয় না, কর্মীদের অনেক ট্যাক্স দিতে হয় না কিন্তু ঋণটা তো পরিশোধ করতেই হবে। ঋণ পরিশোধের চাপও কিন্তু আস্তে আস্তে তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে প্রবাসীরা যে দেশে টাকা পাঠাবে সেক্ষেত্রে ডলারের দামটা বাড়াতে গিয়ে টাকার দাম কমে যাচ্ছে। অনেকে দেশে টাকা পাঠাতে অন্য রাস্তা ধরেছে। কঠিন করোনাকালে আমদানি কমে গিয়েছিলো আবার সেসময় প্রবাসীরা ফরমাল চ্যানেলেই টাকা পাঠিয়েছে তাই আমরা সেসময় রিজার্ভের স্ফীতি দেখি। কিন্তু সেটা যখন চলে গেলো, অর্থনীতি অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় এলো তার সাথেই ডলারের সংকটটা তৈরি হল তখনই অনেক প্রবাসীরা টাকা পাঠানোর ভিন্ন রাস্তা খুঁজছে। একদিকে বেশি ডলার ক্ষয় হচ্ছে, বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে স্বল্পমেয়াদী ঋণের চাপটাও তৈরি হচ্ছে। আরেকদিকে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। টাকা পাচার হলে তো তা ডলারেই হবে টাকায় হবে না সুতরাং ডলারের ওপর চাপ পড়ছে।
জুলিয়া: উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং এক্ষেত্রে সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন কি?
আনু মুহাম্মদ: উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণ এক হচ্ছে ইমপোর্ট। যেসব পণ্য আমাদের আমদানি করতে হয় সেগুলোর সাথে তো বিশ্ববাজারের সম্পর্ক আছেই। তবে যেমন ধরেন এলএনজি- এটা আমাদের দরকার ছিলো না কিন্তু এর আমদানি নির্ভরতা তেলের দাম ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করলো। বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে দাম বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন ছিলো না। আগে ২০১৪ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অনেক কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন মুনাফা করেছে যা এই বছরের ফেব্রুয়ারি নাগাদ ছিলো প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। সেই মুনাফার লস হয় ১০ হাজার কোটি টাকার মতো। সেটা ৪৮ হাজার কোটি টাকা সাথে সমন্বয় করা যেতো। সেটা না করে তেলের দাম বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতিতে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। জিনিসপত্রের দাম, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সাথে বাসা ভাড়াও বেড়ে যায়। এই সব কিছুর পেছনে তেলের অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধি বড় কারণ।
আমাদের বাংলাদেশের আপনি যদি কর্মসংস্থানের গঠন দেখেন, মানুষের জীবন-জীবিকার চিত্র যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখবো যে, মাসে মাসে নিশ্চিত আয় করছে এরকম মানুষের সংখ্যা শতকরা ১০ ভাগের বেশি হবে না। ইনফরমাল সেক্টরেই ৮৫ শতাংশই শ্রমজীবি মানুষ। তাদের নিশ্চিত কোনো আয় নাই। জীবিকার জন্য তাদের নানা বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়। তাদের চাঁদা দিতে হয়, পুলিশের লাঠি খেতে হয়। নানা রকমের প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টা করে। করোনা তাদের জীবিকায় বড় একটা ধ্বস নামালো। করোনাকালে অভাবে বহু পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়েছে, অনেক পরিবারে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ হচ্ছে খুব কম সংখ্যক দেশের একটা যেখানে বিশাল সংখ্যক শ্রমজীবি মানুষ গুরুত্ব পায় না।
করোনার পর তারা কর্মবাজারে প্রবেশ করতে চেষ্টা করছে, তারা পারছেনা এবং খাদ্য বিষয়ে আমরা বিভিন্ন সমীক্ষা দেখি তা ভয়ংকর রকম ভারসাম্যহীন খাদ্য এখন বেশিরভাগ মানুষের। মাছ, মাংস, সবজি, দুধ, ডিম এগুলোর যে একটা কমবিনেশন দরকার হয় একটা মানুষের ঠিকমত বেঁচে থাকার জন্য। বিশেষত শিশুদের জন্য যেটা দরকার হয়। সেটি বেশিরভাগ মানুষ পায়না। ফলে খুবই ভারসাম্যহীনভাবে জীবনযাপন করছে। চাউলের দামও তো বেশি, মোটা চাউলের দামও বেশি। ধরুন আগে মাছ, মাংস যারা নিয়মিত খেতে পারতো না। ডিমটা দিয়ে ঐটা কাভার করতো। ডিমের দামও বেশি। ঐটা বাদ দিয়ে যদি সবজি খেতে যায়। সবজির দামও বেশি। মানে কোনো জায়গায় হাত দেওয়ার বা পা ফেলার কোনো উপায় নাই। সেরকম একটা অবস্থায় আপনি যদি পাশাপাশি দেখেন এই যে, সমাজের মধ্যে বৈষম্যটা এইটা একটা ভয়ংকর রকম চেহারা নিচ্ছে বৈষম্য আগেই ছিলো। যেমন আমরা সরকারের সর্বশেষ যে হাউজহোল্ড ইনকাম, এক্সপেনডিচার জরিপ দেখি সেটা খুবই চিন্তার বিষয় এবং এতে সরকারের নীতি নির্ধারকদের অস্থির হওয়ার কথা। যে আপনি যদি ১০ ভাগে ভাগ করেন জনসংখ্যাকে প্রথম শতকরা ১০ ভাগ যাদের আয় সবচেয়ে বেশি তাদের আয়টাই বেড়েছে, জিডিপিতে তাদের অনুপাতটাই বেড়েছে। বাকি শতকরা ৯০ জন প্রত্যেকের অনুপাত কমেছে এবং সবচেয়ে কমেছে একদম নীচের যে ১০ ভাগ তাদের। একদিকে আয় কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এটা কিভাবে মানুষ মোকাবেলা করবে? একটা পথ মানুষ নেয়। সেটা হচ্ছে যে, ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করার কথা তাদেরকে কাজের মধ্যে ঢুকায়। কিন্তু কাজেরও তো জায়গা সেভাবে নাই। এইযে আমরা যে, এত ইজিবাইক দেখি-বহুজনকে পাবেন যারা কিছুদিন আগে বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাঁটাই হয়েছে কিংবা তাদের পরিবার চলছে না। তারা কোনো না কোনো ভাবে আয় করার চেষ্টা করছে ইজি বাইকে, রিক্সায়, রাস্তার পাশে ফুটপাতে যে বিভিন্ন ধরনের হকারিতে আমাদের প্রায় ৮৫% মানুষ ইনকাম করার চেষ্টা করে। তাদের কোনো খাদ্য নিরাপত্তা- এক হচ্ছে, পুষ্টিগত অবস্থা নাই। তাদের জন্য যথেষ্ট যে খাবার দরকার। সেটা থেকে তারা অনেক দূরে এবং একটা দেশে ধরেন, ন্যূনতম মজুরী তো দারিদ্রসীমার আয় থেকে নীচে হতে পারেনা। তো বাংলাদেশে আমরা দেখি ন্যূনতম মজুরী যেটা সেটা দারিদ্র সীমার আয়ের অর্ধেকেরও কম। তো একটা দেশের বিশাল সংখ্যক মানুষ যদি দারিদ্র সীমার আয়ের নীচে তারা আয় করে,পরিবারের সবাই মিলে কাজ করেও যদি দারিদ্রসীমার ওপরে উঠতে না পারে এটা তো একটা জাতীয় দুর্যোগ। এটাকে তো শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে দেখলে হবেনা। পরিসংখ্যানের পেছনের মানুষগুলোকেও দেখতে হবে। পরিসংখ্যান দিয়ে - এত শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে, এখন এত শতাংশ দারিদ্র সীমার ওপরে এগুলো বলে এই জিনিসটা বোঝা যাবে না। প্রত্যেকটা জায়গায় মানুষ তাদের সংকট মোকাবেলা করতে গিয়ে তাদের আয়ুসীমা কমে যাচ্ছে। আপনি গড় আয়ুসীমা ধরলে হবে না কিংবা গড় মাথাপিছু আয় ধরলে হবে না। যেহেতু আমাদের অর্থনীতি মানুষের অবস্থা অনেক বেশি বৈষম্যমূলক। সেজন্য আপনি যদি এটাকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে না দেখেন তাহলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যাবেনা।
জুলিয়া: কিছুদিন আগে সরকার থেকে দুর্ভিক্ষের আভাস দেওয়া হয়েছিল। যদিও পরে সরকার সেখান থেকে সরে এসেছে। এখন বলা হচ্ছে- কোনো জমি পতিত না রেখে ফসল উৎপাদন করা। এখানে কোনো নীতি, প্রণোদনা দেওয়ার দরকার আছে কী?
আনু মুহাম্মদ: আসলে প্রধানমন্ত্রী কেনো দুর্ভিক্ষের আশংকা প্রকাশ করেছিলেন আমি জানি না। জাতীয়ভাবে ম্যাক্রো লেভেলে দুর্ভিক্ষ হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। খাদ্য উৎপাদনের কথা যদি ধরেন, উৎপাদনে আমাদের কিছুটা ঘাটতি আছে কিন্তু এতো ঘাটতি নাই যে মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যাবে। তবে এটিও ঠিক যে ৪৩ এর দুর্ভিক্ষ, ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ সে সময় খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি ছিলো না। অর্মত্য সেন যেটা স্টাডি করে দেখিয়েছেন। বিআইডিএস এর অর্থনীতিবিদ মহিউদ্দিন খান আলমগীরও গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, সে সময় খাদ্য উৎপাদন মোটামুটি ঠিকই ছিলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশিই ছিলো। সমস্যাটা হয় মানুষের ক্রয় ক্ষমতায়। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা যদি না থাকে আপনার বিশাল খাদ্য মজুদ থাকলেও কোনো সুবিধা নাই। আপনি এখনো ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বাজারে যান। খাদ্যের সাপ্লাইতো দেখা যাচ্ছে কিন্তু কিনতে পারছে না মানুষ। মানুষ এখন টুকরা টুকরা করে কিনছে। যেটা আমরা আগে শুনতাম। কোন দেশে যেন মাছ টুকরা করে কেনা যায়। বাংলাদেশে এটা নিয়ে হাসাহাসি হতো। তাই আমি বলবো দুর্ভিক্ষ ব্যাপক অর্থে না হলেও এখন যদি খেয়াল করি তাহলে দেখবো বিপুল সংখ্যক মানুষ একটা অনাহারী অবস্থার মধ্যে আছে। আর যেটা আহার করে কী আহার করে? ধরেন, বন রুটি, কলা বাংলাদেশের শ্রমজীবি মানুষের একটা অন্যতম খাবার। সেই বন রুটি, কলারও তো দাম এখন বেড়ে গেছে। এখন এরকম অবস্থায় সরকার কৃষি জমির উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলেছে। উৎপাদন বাড়লেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তাতো না। উৎপাদন বাড়ার অবস্থাতেই আমরা ৭৪ ও ৪৩ এ দুর্ভিক্ষ দেখেছি। আরকটি বিষয় সরকার থেকে বিভিন্ন সময়ে আমরা শুনেছি। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন যে, কৃষি জমি নষ্ট করে কোনো কিছু করা যাবে না। কিন্তু উল্টো চিত্র আমরা দেখি বাস্তবে। অনেক সরকারি প্রকল্পও ব্যাপকভাবে কৃষি উৎপাদন, প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর ভয়ংকর প্রভাব ফেলছে। কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পও তাই। এর বাইরে বাংলাদেশে এখন খুবই বুমিং একটা ব্যবসা ইটের ভাটা। সরকারি ডকুমেন্টেই দেখা যাচ্ছে ৬০ শতাংশেরই বেশি ভাটার লাইসেন্স নেই। সারা বাংলাদেশেই কৃষি জমিতে ইটের ভাটা হচ্ছে। জমির ওপরের উর্বর স্তরের মাটি দিয়েই তারা ইট তৈরি হচ্ছে। ইটের ভাটার আশেপাশের কৃষি জমি নষ্ট হয়। মাছ নষ্ট হয়, গাছপালা নষ্ট হয়। সেগুলো করছে লাইসেন্স ছাড়া বেআইনি ইটের ভাটা। আর বেআইনি হওয়ায় সরকারি মনিটরিংয়ে থাকছে না। স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও হচ্ছে। ইটের ভাটার অঞ্চলের মানুষের অসুখ-বিসুখ বেড়ে যায়। কৃষি জমিতে একের পর এক হাউজিং হচ্ছে। ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত দুই পাশে তো কৃষি জমি সব এখন হাউজিং। হাউজিং ব্যবসায়ীদের জন্য এটা খুব ভালো খবর কিন্তু কৃষি উৎপাদনের জন্য তো এটা ভয়ংকর। তাই নীতিমালা থাকতে হবে যে, আমাদের কৃষি উৎপাদন, খাদ্য উৎপাদনকে কোনভাবেই ঝুঁকিতে ফেলা যাবেনা। বড় বড় বিল্ডিং উঠালে দেখতে বেশ উন্নয়ন মনে হয় কিন্তু সেটা যদি মূল জায়গাতে আঘাত করে। আমাদের খাদ্য, আমাদের পানি, আমাদের বাতাস যদি বিপর্যস্ত হয়। তাহলে বড় বড় ভবনই থাকবে, মানুষ তো থাকবেনা।
জুলিয়াঃ জ্বালানি সংকট নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন রাখতে চাই- জ্বালানি সঙ্কট এখন দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বাঁধা হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমদের দেশের ভূগর্ভে তো গ্যাস ছিলো, কয়লা ছিলো, এখনও আছে। তারপরও এতটা সঙ্কটে কেন পড়লাম?
আনু মুহাম্মদঃ সংকটটা তৈরি হয়েছে কিছু গোষ্ঠীকে ব্যবসা দেয়ার নীতিমালায় প্রাধান্য পাওয়ার কারণে। একটা সরকারের ওপর তো নানা রকম চাপ থাকে, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপ থাকে। জনগণের তো চাপ তো থাকতে পারে না। কারণ এখন জনগণের তো আর এরকম শক্তি নাই। যেমন কৃষকরা জেলে যায়। ঋণখেলাপিরা ঘুরে বেড়ায়। বিভিন্ন লবি থাকে তারা তো তাদের মুনাফা দেখবেই। সরকারের দায়িত্ব তারা দেখবে ভিশন থেকে-কোনটা দেওয়া যাবে, কোনটা দেওয়া যাবে না, কোনটা দিলে বিপদ হবে, কোনটা দিলে তার জন্য ভালো, দেশের জন্য ভালো সেটা তো সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু এই জায়গাটায় বড় ধরনের বিচ্যুতি দেখা গেলো। দেখা গেলো যে, ব্যবসায়ী লবি পুরো নীতিটা তাদের পক্ষে নিয়ে যেতে চাচ্ছে ব্যবসার জন্য। তারা বিজয় অর্জন করলো। তার ফলেই ২০১০ এ করা হলো দায়মুক্তি আইন। দায়মুক্তি আইন মানে হচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের কর্মকর্তারা যাই করুক না কেন সেখানে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। যখন আইন হয় তখন আমরা সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রতিবাদ করেছিলাম বলেছিলাম ভয়ংকর ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকার বললো যে, আমাদের জরুরী বিদ্যুতের জন্য কুইক রেন্টাল করতে হবে। এখন সময় নাই। আমরা তখন সমাধানের পথও দেখিয়েছিলাম যে পরিমাণ বিদ্যুতের ঘাটতি আছে তা পাওয়ার ক্ষেত্রগুলো আমরা দেখিয়েছিলাম। কুইক রেন্টাল রেন্টালের সাথে যুক্ত ব্যবসায়ী লবি এতই শক্তিশালী যে তারা তো চুক্তি করলোই তারপর দেখা গেলো চার বছর পর পর এটার মেয়াদ বাড়ছে, দায়মুক্তি আইনেরও মেয়াদ বাড়ছে। দুটোরই মেয়াদ বাড়তে থাকলো এবং এর মধ্যে যারা ঢুকলো তারা হলো এলএনজি ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে ঢুকলো আমদানীকৃত কয়লা নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রওয়ালা। ঢুকলো বিভিন্ন দেশের কোম্পানি- চীনা, ভারতীয়, জাপানী বা রাশিয়ান কোম্পানি। তারা ব্যবসার জায়গা তৈরি করে নিলো। এই পুরো দৃশ্যটা যদি একটা চিত্রনাট্য লেখেন মনে হবে যে, কিছু গোষ্ঠী তারা চালাচ্ছে সরকার। সরকার সেখানে পরিচালিত, পরিচালক না। ফলে ব্যয় বেড়ে যেতে থাকলো। জ্বালানি বিদ্যুতের ব্যয়। ফলে দামটা বাড়তে লাগলো। তারপরও একটা পর্যায়ে আমরা দেখলাম, দাম বাড়লো, সবই বাড়লো। উৎপাদনের সক্ষমতা ইন্সটল ক্যাপাসিটি এতো বাড়লো যে, ঐ রেন্টাল কুইক রেন্টাল সমস্ত ব্যবসায়ী তাদেরকে বসিয়ে রাখতে হলো। চুক্তিও এমন করতে পারলো যে, তারা বসে থাকলেও তাদেরকে টাকা দিতে হবে। ২০১১ থেকে শুরু করে ২০২২ এর মধ্যে মাত্র ১১টা কোম্পানিকে দিতে হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। এটা কী করে সম্ভব! যে কোনো বিদ্যুতও দিলো না, বসেই থাকলো দায়মুক্তি আইনে চুক্তির কারণে তারাই টাকা পেয়েছে। ৬০ হাজার কোটি টাকা মানে হচ্ছে আমাদের দেশে বছরে স্বাস্থ্য খাতে যে ব্যয় হয় প্রায় তার দুই বছরের সমান। সেটা কয়েকটা কোম্পানি মিলে পেলো। এইসব টাকা তো আর দেশে থাকে না। এই সব টাকা বিদেশে পাচার হলে তো সেটা তো আবার বৈদেশিক মুদ্রাতে পাচার হয়। তো এই পদ্ধতিতে তো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট দূর হবে না। আমরা ২০১৭ সালে বিকল্প মহাপরিকল্পনা সরকারকে দিয়েছিলাম। দেশি প্রবাসী বাংলাদেশী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আমরা দুই বছর কাজ করে বের করি যে, বিকল্প কী? আমরা পরিষ্কারভাবে দেখালাম যে, আমাদের সমুদ্রে, স্থলভাগে যে গ্যাস আছে তা অনুসন্ধান করে উত্তোলন করলে দামটা কমে আসবে। এই গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংমিশ্রণে যদি করা হয়, তাহলে আমাদের বিদেশী ঋণ নির্ভরতা, আমদানি নির্ভরতা, বিদেশী কনসালটেন্সি নির্ভরতা এবং খুবই ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প কমে আসবে। আরকটি দিক হলো আমরা মনে করি সারা পৃথিবীর অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের মানুষ, জীবন- জীবিকা, বাংলাদেশের প্রকৃতি- নদী, নালা, খাল-বিল, কৃষি জমি সমস্ত কিছু বিচার বিবেচনায় বাংলাদেশে কয়লা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর বাংলাদেশ ঘনবসতি এবং আমাদের প্রধান সম্পদ হচ্ছে মাটির নিচের পানি, মাটির ওপরের পানি আর কৃষি জমি। তাই কয়লা বিদ্যুৎ ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোনটাই বাংলাদেশের প্রয়োজন নাই বরং বাংলাদেশের জন্য বিপদজনক। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে। ভবিষ্যতের জ্বালানি হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি। সুতরাং এই দুইটার কমবিনেশন বাংলাদেশের জন্য সহজ সমাধান ছিলো। কিন্তু সরকার এই পথটা গ্রহণ করে নাই, কোনো চেষ্টাও আমরাও দেখি নাই। কয়েকদিন আগে দেখলাম যে, এক মন্ত্রী সাহেব কপ-টুয়েন্টি সেভেনে গিয়ে বলেছেন, আমরা ’৪১ সালে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করবো। মন্ত্রী সাহেব জানেন যে, সরকার যেভাবে আগাচ্ছে তাতে সেটি সম্ভব না।
জুলিয়াঃ অনেকে বলছেন, দেশের ভেতর আন্দোলন ও প্রতিরোধের কারণে আমরা সময় মতো নিজস্ব জ্বালানি উত্তোলনের পরিকল্পনা করতে পারি নাই বা পরিকল্পনা করিনি। বাস্তবায়নও করতে পারিনি।
আনু মুহাম্মদঃ কোথায় আন্দোলন, প্রতিরোধ। আন্দোলন, প্রতিরোধের তো কোনো খবর নাই। আমরা আন্দোলন করেছি সুন্দরবন রক্ষার জন্য। রামপাল তো বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট দূর করার প্রকল্প না। এটা সুন্দরবন বিপদে ফেলার প্রকল্প। আরো শক্তিশালী প্রতিবাদ হওয়ার দরকার ছিলো। আপনি বলতে পারেন যে, সরকার যেসমস্ত নীতিমালা গ্রহণ করেছে। সেসমস্ত নীতিমালার বিরুদ্ধে জনগণের পক্ষ থেকে আরো শক্তিশালী প্রতিবাদ হলে, তাহলে নীতিমালা হয়তো আসতো। সেটা করা যায় নাই। এটার জন্য আমাদের বাংলাদেশের সবারই দায়িত্ব আছে। অনেকে আত্মসমর্পণ করেছেন। কোনো প্রকল্পের সমালোচনা করা যাবে না বলে একাধিক বিশ্ব বিদ্যালয় রামপাল প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পায় নাই। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে না পারে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কী কারণে আছে? এতগুলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ব বিদ্যালয়। তারপরও আমরা বলি সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান করবো না, আমরা পারিনা, পারবো না। সারাক্ষণ আমরা শুনি যে, আমরা পারি। আবার যখনই আমাদের প্রয়োজনীয় কাজের মধ্যে যাওয়া হয় তখনই আমরা পারিনা। পরিষ্কার যে নীতিমালাগুলো গ্রহণ করা দরকার ছিলো যে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, জাতীয় সংস্থাকে শক্তিশালী করা দরকার ছিলো সুলভে পরিবেশবান্ধব উপায় ও পথ অনুসন্ধান করা হয়নি বলেই এ সমস্যাটা হয়েছে।
জুলিয়াঃ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চলমান সংকটে রাজনীতি বা রাজনৈতিক অর্থনীতির দায় কতটুকু?
আনু মুহাম্মদঃ বর্তমানে যে সরকার ক্ষমতায় আছে। তারা তো ২০১৪ সালের পর থেকে মোটামুটি যে একচেটিয়া ক্ষমতায় আছে। দেখুন রাজনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিবাদ, সংলাপ জরুরি। মিডিয়ারও নানা ধরনের মত তুলে ধরা জরুরি। সব জায়গায় ভীতি কাজ করছে। যেমন ধরেন, বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাই তো মত প্রকাশ করে। তাদের সুযোগ আছে, তাদের অবকাশ আছে। কিন্তু
বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলোতে ভয়ংকর অবস্থা। শিক্ষকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে যে, এমন সব উপাচার্য সরকার নিয়োগ দিচ্ছে যে উপাচার্যের প্রধান যোগ্যতা হতে হবে আনুগত্য তথা প্রশ্নহীন আনুগত্য। সরকারের সেবা করাতো বিশ্ববিদ্যালয় কাজ না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো দেশের স্বার্থে প্রয়োজনীয় যে চিন্তা, সরকারের নীতিমালায় যে ভুল হয় সে ব্যাপারে সমালোচনা করা। সরকার যদি ঠিক করে সেটার প্রশংসা করা। সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য গবেষণা করা। এই জায়গাগুলো তো বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জনগণের মধ্যে থেকে জনগণের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি কাজ যদি করতে না পারে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি এরকম চিন্তার অচলায়তনে পড়ে। তাহলে এমন ধরনের শক্তি সামনে আসতে পারে, যারা পুরো দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হবে।
আরেকটা বিষয় আমরা দেখেছি সত্তর দশকে আশির দশকে যারা আওয়ামী লীগের খুব সমালোচনা করতো তারা এখন আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ অনুসারী এবং তারা কিছু সুবিধা-টুবিধাও নিচ্ছে। এটা আমাদের অর্থনীতি এবং রাজনীতি দুটোর জন্যই খুব বিপদজনক।
রাজনীতির একটা বড় বা কেন্দ্রীয় জায়গা হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনের মতো নির্বাচন যদি না থাকে তাহলে বুঝতে হবে দলগুলোর অবস্থাও খারাপ। বাংলাদেশে নির্বাচনটা একটা বিশাল উৎসবের ব্যাপার। এই উৎসবটা এদেশের জন্য একটা শক্তিও। মানুষ তার মত প্রকাশ করতে চায় তার প্রার্থী বাছাই করতে চায়।এরমধ্যে নানা রকম সমস্যা ছিলো কিন্তু ঐ জায়গায়টা থেকে সরে যাওয়ার ফলে রাজনীতি ও অর্থনীতিতে দূষণ বেড়েছে অনেক বেশী এবং সেই দূষণটা সরকারী দলকে যে দীর্ঘমেয়াদে সাহায্য করবে এটা আমার মনে হয় না এটা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্যও একটা পর্যায়ে আত্মঘাতী হিসাবে চিহ্নিত হবে।
জুলিয়া: আপনাকে ধন্যবাদ
আনু মুহাম্মদ: আপনাকেও ধন্যবাদ
একাত্তর/এসি