দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমে করোনাভাইরাস মহামারীর আগের অবস্থায় ফিরে গেছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএস।
সংস্থাটির মনে করছে, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা নিয়ে এখনো অনেক সংস্থা দুই বছর আগের যেসব পুরনো তথ্য-উপাত্ত দিচ্ছে তাতে বিভ্রান্তি বেড়ে যাচ্ছে।
তবে শহুরে নিম্নবিত্ত মানুষের প্রতি বিশেষ নজর দেয়ার পরামর্শ দিয়ে বিআইডিএসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মহামারীতে হঠাৎ গরীব হওয়া মানুষের অর্ধেকই এই শ্রেণীর।
আর বৈষম্যের কথা মেনে নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলছেন, দেশে সম্পদ সৃষ্টির সঙ্গে অবধারিতভাবে যে বৈষম্য তা নানা কারণে সামাল দেয়া না গেলেও বৈষম্য কমানোর চেষ্টা চলছে।
বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, ২০১৯ থেকে ২০২২-এর মধ্যে সামগ্রিক দারিদ্রের হার চার দশমিক তিন শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। একই সময়ে চরম দরিদ্র পরিবারের অনুপাতও তিন দশমিক দুই শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে।
অর্থাৎ সামগ্রিক দারিদ্রের হার ২৬ দশমিক ৫৪ থেকে ২২ দশমিক ২৪ শতাংশে এবং অতি দারিদ্রের হার ১৭ দশমিক ০৮ থেকে ১৩ দশমিক ৮৩ শতাংশে নেমে গেছে।
কোভিড-১৯ এর চাপের মধ্যে দারিদ্রতা হ্রাসে এটিকে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে অভিহিত করেছেন এই গবেষক।
২০২০ সালে এপ্রিল থেকে জুন সময়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে থাকায় টানা লকডাউন দেয় সরকার। সে সময়ে শিল্পোৎপাদন সীমিত হয়ে যায়, সেবা খাতসহ সবখানেই ছিল ধীরগতি।
এই সময়ে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪০ শতাংশের উপরে চলে যায় বলে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান দাবি করে বসে। অবশ্য ওইসব দাবিকে উড়িয়ে দিয়ে বিনায়ক সেন।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপে, দেশে দারিদ্রের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক মনে করেন, মহামারীর মধ্যে দারিদ্র কমার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো- নিজস্ব কর্মসংস্থানের উদ্যোগ, মহামারীর আগে থেকেই আর্থিক সঞ্চয় এবং মোবাইল আর্থিক পরিষেবাগুলোর মত সহজে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ পাওয়া।
ধাপে ধাপে করোনার তান্ডব কমলেও এখন বিশ্বব্যাপী চলছে অর্থনৈতিক মন্দা। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণসহ অভ্যন্তরীণ বাজারের অব্যবস্থাপনায় বেড়েছে সকল পণ্যের দাম, জীবনযাত্রার খরচও লাগামহীন।
গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শহরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৫১ শতাংশই নতুন করে দরিদ্র হয়েছে।
বিআইডিএসের জরিপ বলছে, ২০১৯ সালে ধনীদের মাথাপিছু আয় ছিলো সাড়ে আট লাখ টাকার বেশি যা গেলো তিন বছরে বেড়েছে অন্তত সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। অন্য দিকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আয় বেড়েছে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা।
এসময় বেশিরভাগ শহুরে নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে শিশুদের স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ।
সবমিলিয়ে বৈষম্য আরও প্রকট হচ্ছে বলে বিআইডিএসের গবেষণায় উঠে এসেছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, দারিদ্রতা অবধারিত কোনও বিষয় নয়। এটা বঞ্চিত, সৃষ্ট কিছু সমস্যা। সব সমাজেই এটা তৈরি হয় এবং এটাকে আমাদের অ্যাড্রেস করতে হবে।
‘সম্পদ যখন সৃষ্টি হয় তখন বৈষম্য দেখা দেয়। কারণ কেউ মেধার গুণে বা যোগ্যতার ভিত্তিতে বেশি সম্পদ সৃষ্টি করে। সরকার বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার সমতা সৃষ্টিতে কাজ করছে। যাতে সবাই সমান সুযোগ পায়।’
সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে বৈষম্য ও দারিদ্রতা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, করোনার সময় দারিদ্রতা বেড়েছিল এটা ঠিক। কিন্তু সরকারের সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগে তা নিয়ন্ত্রণ কমানো সম্ভব হয়েছে।
‘বিশেষ করে করোনার সময়ে বিভিন্ন উৎপানমুখী শিল্প কারখানা বন্ধ না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির প্রভাব পড়েনি।’
বিনায়ক সেন আরও বলেন, করোনার সময় দারিদ্রতা বাড়লেও সেটা ছিল সাময়িক। পরবর্তীতে এটা কমতে শুরু করে। এক পর্যায়ে স্বাভাবিকে চলে যায়।
একাত্তর/আরবি