বাংলাদেশের বিনিয়োগে শীর্ষ দেশ ভারত!

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই বিনিয়োগ যাচ্ছে ভারতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ৫ আগস্টের পর দেড় বছরে ভারতে অনুমোদনহীন বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১৩০০ কোটি টাকা। বিদেশি বিনিয়োগের গতিবিধি পর্যালোচনায় এ তথ্য উঠে এসেছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারাই রয়েছেন এসব বিনিয়োগের নেপথ্যে। 

দেশে বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত হলেও বিদেশে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ এখনো নিয়ন্ত্রিত। কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশে কারখানা বা কোম্পানি করতে চাইলে আগে নিতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

২০২০ সালে ভারতে বিনিয়োগের অনুমতি নেয়া একমাত্র প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল। নিজ দেশে অনুমতি মিললেও ছাড়পত্র দেয়নি ভারত। ফলে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসিত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৯ সালের ভারতে একটি নিলামে অংশ নিতে দেশটিতে কোম্পানি খোলার অনুমতি চায় সামিট গ্রুপ। মাত্র ১ লাখ রূপি বিনিয়োগের অনুমতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া আসবাবপত্র খাতের কোম্পানি অটোবি ও ইস্পাত খাতের বি/এস/আর/এম ভারতে ব্যবসার সুযোগ খুঁজতে অফিস খোলার অনুমতি নেয়। তবে কোনো বিনিয়োগ হয়নি। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক এজাজুল ইসলাম একাত্তরকে বলেন, এ অর্থ দুই ধরনের লোক নিয়ে যেতে পারে। একটা হচ্ছে, গত সরকারের আমলে যারা ব্যাংক থেকে নানা পন্থায় ঋণের নামে অর্থ বের করে নিয়েছে তারা। অথবা যারা আগের সরকারের সুবিধা বুকে ছিল তাদের অনেক নেতাকর্মী এখন ভারতে অবস্থান করছে। ওইসব নেতাকর্মী তাদের দেশের সম্পদ বিক্রি করে বিভিন্নভাবে এই অর্থ নিয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এ অর্থ অবশ্যই অবৈধ পন্থা। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে নজরদারি বাড়িয়ে অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে।

ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, এই বিনিয়োগ আগের সরকারের সুবিধাভোগীরা করে থাকতে পারে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রভার ওয়েতে বিনিয়োগ করা হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত এটিকে আমরা হিসাব করতে পারবো না। অর্থাৎ এটি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন না নিয়ে যদি গিয়ে থাকে তাহলে ব্যাংকের হিসাবে আসবে না। আর এটা অর্থ পাচারের পর্যায়ে পড়ে।

অথচ ৫ আগস্টের পর থেকে ভারতে হুহু করে বাড়ছে বাংলাদেশি বিনিয়োগ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস শেষে দেশটিতে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। টাকায় যা ১ হাজার ২৮৮ কোটি। যার ৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার গিয়েছে খনিজ সম্পদে। বাকি ৫ কোটি ১১ লাখ ডলার বিনিয়োগ হয় আর আর্থিক খাতে। এ তথ্য নিয়ে চিন্তিত খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, আমাদের তথ্য অনুযায়ী যেহেতু বৈধ পন্থায় কোন বিনিয়োগ হয়নি সেহেতু এ বিষয়ে আমাদের কোন মন্তব্য নেই। যদি কোন ভাবে এ ধরনের বিনিয়োগ হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তা অবৈধ পন্থা। আমাদের নজরে আসলে আমরা তা খতিয়ে দেখব।

কর্মকর্তাদের ধারণা, জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার দেশটিতে আশ্রয় নেন অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। দীর্ঘ দিন সেখানে অবস্থানের কারণে হাতে থাকা অর্থ অথবা ইতোপূর্বে পাচার করা টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবির) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান একাত্তরকে বলেন, সোজা কথা এটি দুর্নীতি, অনিয়ম, অবৈধ এবং বিশেষ করে অর্থপাচার। এর সাথে যারা জড়িত তাদেরকে চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে এই পাচারের পথ বন্ধ করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সিস্টেম কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড এর সাথে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের দেশে অথবা বিদেশে আর্থিক লেনদেনের সব তথ্য গোয়েন্দা সংস্থা গুলোর হাতে চলে যাবে। এতে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে অর্থ পাচার বন্ধ করা বা ওই অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু এ বিষয়ে বারবার দাবি জানানোর পরও সরকার এতে যুক্ত হয়নি। এমনকি দুদকের সংস্কারের প্রস্তাবনায় এই বিষয়টি উল্লেখ ছিল।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের বাইরে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি ২১ লাখ ডলার। ভারত ছাড়াও বিনিয়োগ আছে যুক্তরাজ্যে ১০ কোটি ২১ লাখ, চীনে ৮ কোটি, আমিরাতে ৬ কোটি ১৩ লাখ ডলারসহ মালয়েশিয়া, কেনিয়া, সিঙ্গাপুর, আয়ারল্যান্ড, ওমান ও মিশরে।