আগামী মার্চ মাসের মধ্যে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। এ লক্ষে পুণর্গঠন, পুনঃতফসিল, অবলোপন ও ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করতে ব্যাংকারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের এসব নির্দেশ দেন গভর্নর। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ চার ডেপুটি গভর্নর ও সব বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার কমে ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাদ দিলে এই হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিলো প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংকার্স সভায় গভর্নর বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ আদায়ের বিকল্প নেই। ব্যবসায় লোকসান ও নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তবে এ সুযোগ বারবার আসবে না। নীতিমালার আওতায় যতোটা সম্ভব উদারভাবে পুনঃতফসিল করার নির্দেশনাও দেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিলের ফলে ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ দশমিক ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। মার্জ হওয়া পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি বাদ দিলে খেলাপির হার প্রায় ২৫ শতাংশে দাঁড়ায়।
সভায় মাইক্রো লোন ও ডিজিটাল ন্যানো লোন কার্যক্রম নতুন করে সাজানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব ঋণ যেন খারাপ গ্রাহকের হাতে না পড়ে এবং ভবিষ্যতে খেলাপির ঝুঁকি তৈরি না হয়, সে জন্য শুরু থেকেই সতর্কতা ও নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
গণভোটে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিটি ব্যাংক শাখায় দুটি করে ব্যানার টাঙানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নির্দেশনা এসেছে বলে সভায় জানানো হয়। পাশাপাশি এনজিওগুলোর জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিতে সিএসআর তহবিল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ব্যাংকার্স সভায় স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপককে বছরে কমপক্ষে দুটি স্কুল পরিদর্শন করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খোলায় উৎসাহিত করতে হবে।
সভায় জানানো হয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ঊর্ধ্বমুখী। সামনে রমজান ও কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বৈদেশিক বাণিজ্যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে দেশে ও বিদেশে বিনিয়োগ এবং বিদেশে অফিস খোলার ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৯৭৪ (ফেরা) পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেন গভর্নর। নীতিমালা সংশোধনের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রায় বিনিয়োগ আরও উদার করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
সভায় আরও জানানো হয়, বিদেশে থাকা ব্যাংক মালিকানাধীন এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর অনেকগুলো লোকসানে চলছে। এগুলো লাভজনক করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সুদের হার প্রসঙ্গে জানানো হয়, মূল্যস্ফীতি না কমায় আপাতত সুদের হার কমানোর সুযোগ নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে কীভাবে সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামানো যায়, সে বিষয়েও কাজ চলছে।