ইসলামী ব্যাংক আর কোনো দল বা পরিবারের হয়ে কাজ করবে না: গভর্নর

এখন থেকে ইসলামী ব্যাংক কোনো দল বা পরিবারের হয়ে কাজ করবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান, চারজন বোর্ড সদস্য ও ব্যাংকটির শীর্ষ ১০ কর্মকর্তার সাথে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।

সেখানে গভর্নর বলেন, একসময় দেশের অন্যতম সেরা ব্যাংক ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। তবে মাঝামাঝি সময়ে ব্যাংকটির করপোরেট গভর্নেন্সে কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংকটি একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি অনুগত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন থেকে এই ব্যাংক কোনো গ্রুপ, রাজনৈতিক দল বা পরিবারের হয়ে কাজ করবে না। ব্যাংকটিকে সঠিক পথে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।

গভর্নর ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডকে উদ্দেশ করে বলেন, ব্যাংকের সুশাসন ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।

সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কয়েক হাজার কর্মকর্তা চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তাদের অধিকাংশই চট্টগ্রামের একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে বৈঠকে এ বিষয়টি গভর্নর উত্থাপন করেননি বলে বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন-এ পাঠানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শেয়ার মালিকানার মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আটটি ব্যাংকের মধ্যে চারটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে চারটি ব্যাংক থেকে ভুয়া ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে ৯৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদ এবং তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোতে প্রভাব খাটিয়ে নিজের নামে বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে এসব ঋণ নিয়েছেন। এসব ঋণ গ্রহণের সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে নানা সংকটের মধ্যেও গত এক বছরে ইসলামী ব্যাংকের আমানত ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির মোট আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আমানত বেড়ে হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত এক বছরে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। একই সময়ে ব্যাংকটি আমদানি বাণিজ্য করেছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি বাণিজ্য করেছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার। বর্তমানে ব্যাংকটির গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি, যা এক বছরে প্রায় ৫০ লাখ বেড়েছে।

 

এ ছাড়া খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৮ শতাংশ। তবে ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ কমিয়ে ১৪ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা নামাতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ রয়েছে প্রায় ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৪৭ শতাংশ।