দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর চলতি, সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাবধারীদের আমানতের মূল টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) থেকে গ্রাহকেরা তাদের গচ্ছিত অর্থ তুলে নিতে পারছেন। প্রথম দিনে মূলত গত এক সেপ্টেম্বর আবেদনকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর মুনাফা ছাড়া কেবল আসল বা মূল টাকা ফেরত দেওয়ায় আমানতকারীদের মধ্যে যেমন অসন্তোষ দেখা গেছে, তেমনি আর্থিক খাতের বিশ্লেষকেরাও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
ব্যাংক সূত্র জানায়, অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর পর রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত মাত্র ছয় দিনে মোট ৭৪ হাজার ২২১ জন গ্রাহক তিন হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেছেন।
এদিকে টাকা তোলার সুযোগ পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে কয়েকজন গ্রাহক জানান, সঞ্চয়ী হিসাব নম্বরে বিপরীতে চাহিদা অনুয়ায়ী সব টাকাই ব্যাংক দিয়েছে। তবে অনেক অনিশ্চিতার পর টাকা পেয়ে খুশি ব্যাংকটির গ্রাহক। তারা বলেন, ব্যাংক যেভাবে সহযোগিতা করছে, এমন ধারা অব্যাহত থাকলে ‘গ্রাহক আস্থা’ আবারও ফিরে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নীতি অনুযায়ী, গ্রাহকেরা কেবল মূল আমানত তুলে নিতে পারছেন। এ বিষয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এফএসআইবি ইউনিটের এসইভিপি তাহুরুল হক জানান, ‘যদি কোনো গ্রাহক বলেন- আমার এফডিআর কিংবা ডাবল বেনিফিটের টাকা পুরোটাই নিয়ে যাবো, মুনফা চাইনা; সেক্ষেত্রে মুনাফা কর্তন করা হবে। তবে যদি কোনো মুনাফা এর আগে নিয়ে থাকে, তবে সেটা কেটে নেওয়া হবে।’
মুনাফা না দেওয়ার এই প্রক্রিয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। তিনি বলেন, অনেকে তাদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় এখানে জমা রেখেছেন। এখন যদি বলা হয় ২০১৮ সালের পর থেকে কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না, তবে সাধারণ মানুষ চলবেন কীভাবে? এতে তো তাদের মূলধন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে একত্রিত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে মোট ৭৬ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির আমানতের পরিমাণ ৬৮ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর দেওয়া মোট এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৮৬ শতাংশই বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
ব্যাংকটিকে সচল রাখতে ইতিমধ্যে ৫১ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া আমানত সুরক্ষার অংশ হিসেবে আরও ১২ হাজার কোটি টাকার তহবিল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আমরা আগে দেখবো কী পরিমাণ চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে। সেই চাহিদর ওপর ভিত্তি করেই জোগানের পরিকল্পনা করা হবে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিয়তা দিয়েছে। আমরা মনে করি এ নিয়ে ভুক্তভোগী গ্রাহকের যে কষ্ট, তার চেয়ে আমাদের পক্ষে আমানত সংগ্রহ করা বেশি কষ্টের নয়। অতএব, জনগণের স্বার্থ রক্ষা করাই ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব, সেটাই অনুসরণ করা হবে। আশাকরি গ্রাহকের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করা হবে।’