রাজাকারদের মন্ত্রী বানানোর মতো ভুল আর করা যাবে না: জাফর ইকবাল

বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, যে বাংলাদেশের জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, সেই বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজাকারদের মন্ত্রী বানানোর মতো ভুল আর করা যাবে না। আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সামনে সুন্দর বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে। 

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর তোপখানা রোডে সম্প্রীতি বাংলাদেশ আয়োজিত ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার ঠাঁই নেই’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। 

জাফর ইকবাল বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর এক রাতের মধ্যে বাংলাদেশ পুরোপুরি এবাউট টার্ন করেছে। সুন্দর বাংলাদেশকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেই বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতেই আমরা লড়াই করছি।

তিনি বলেন, আমি খুবই আশাবাদী মানুষ। আমি মানুষকে বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের মানুষ যখন প্রয়োজন হয়, তখনই রাস্তায় নেমে আসবে। বাংলাদেশের তরুণেরা ২০১৩ সালে রাস্তায় নেমে এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করেছে।

জাফর ইকবাল বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে রাজাকার যুদ্ধাপরাধীরা মন্ত্রী হয়েছে। সেই ভুল আর করা যাবে না। কেননা, বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে বিশ্বের অন্য কোনো দেশ এত ত্যাগ আর এত রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা কেনেনি। বাংলাদেশের মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। এই দেশ হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসাম্প্রদায়িক দেশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সাম্প্রদায়িকতার ছাড়ানোর জন্য ভয়ংকর স্থান উল্লেখ দিয়ে তিনি বলেন, এই বিপজ্জনক জায়গার বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। তার জন্য তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগাতে হবে, যারা এগুলো খুব ভালো জানে। নতুন প্রজন্ম যারা একাত্তর দেখেনি, তাদের ইতিহাস পড়তে হবে। জানতে হবে। 

জাফর ইকবাল বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে একটা সত্যিকারের রেনেসাঁ, একটা সংস্কৃতির বলয় গড়ে উঠেছিল। আমরা ভেবেছিলাম, আগের সেই সাম্প্রদায়িকতা, হানাহানি আর ফিরে আসবে না। কিন্তু কিছুদিন পরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করল, মুক্তিযুদ্ধে কি এত মানুষ মারা গেছে? রাজাকারদের গাড়িতে মন্ত্রীর পতাকা তুলে দেওয়া হলো। আমাদের আর এমন ভুল করা চলবে না। আমাদের যারা নতুন প্রজন্ম আছে, তাদের সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনুশাসন শিক্ষা দিতে হবে।

সম্প্রীতি বাংলাদেশ আয়োজিত ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার ঠাঁই নেই’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা

অনুষ্ঠানে অন্যতম আলোচক একাত্তর টেলিভিশনের সম্পাদকীয় প্রধান নূর সাফা জুলহাজ তার আলোচনায় মুহম্মদ জাফর ইকবালের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফিল্টার দিয়ে সব দলকে বিবেচনা করতে বলেন। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ নিজে কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফিল্টার দিয়ে পার হতে পারবে?

তিনি আরও বলেন, গত ১৫ বছরে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে কিন্তু রাজনৈতিক প্রবৃদ্ধি কী হয়েছে? সাম্প্রদায়িকতা কমেছে? ধর্মের রাজনীতি কী কমেছে? কালচারাল জিডিপি কী বেড়েছে?

নিজের বক্তব্য মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলেন, এটা সত্য যে আওয়ামী লীগের একটা বড় অংশই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফিল্টারে আটকে যাবে। আপনারা জানেন হেফাজতে ইসলামের দাবীর মুখে সরকার পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী লেখক ছাড়া অন্য ধর্মের অনুসারি লেখকদের লেখা বাদ দেয়। এই জায়গাগুলোকে ঠিক করার জন্য কাজ করতে হবে। এই দেশে সব ধর্মের মানুষ যেন সমান মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন সেই ব্যাবস্থা করতে হবে। 

সম্প্রীতি বাংলাদেশের চেতনা সবাইকে ধারণ করতে হবে উল্লেখ করে তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে এই কথাসাহিত্যিক বলেন, এখন যারা নতুন প্রজন্ম আছে, তাদের অনেকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হানাহানি দেখেনি। আমরা যে চেতনা ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, যে বাংলাদেশ তৈরি করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি, তা বাস্তবায়নের জন্য তরুণ প্রজন্মকে সম্প্রীতি বাংলাদেশের চেতনা ধারণ করতে হবে। প্রজন্মকে ইতিহাস জানাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, হাজার বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করছে। এখানে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ছড়িয়ে পড়ার দায় আমাদেরই। আমরা তাদের একটি ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা দিতে পারিনি। আমি খুবই আশাবাদী লোক। আমি নিরাশ হতে চাই না।

বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার কর্মময় জীবনের বিভিন্ন স্তরে কিভাবে সাম্প্রদায়িকতা দেখেছেন তার বর্ননা করেন। একইভাবে শিশু কিশোরদের মধ্যে মুক্তবুদ্ধি তথা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ কিভাবে প্রোত্থিত হতে পারে সেসব নিয়েও কথা বলেন।
 
নাট্যজন, আবৃত্তিকার ও অভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে অন্যদের মধ্যে অংশ নেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক পূজা উদযাপন কমিটি সাধারণ সম্পাদক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার, ডিবিসি নিউজের সম্পাদক প্রণব সাহা, একাত্তর টেলিভিশনের নূর সাফা জুলহাজ, চিকিৎসক নেতা ও সোহরাওয়াদী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রাক্তন পরিচালক ডা. উত্তম বড়ুয়া, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার ফারজানা মাহমুদ, সময় টেলিভিশনের সম্পাদক মোস্তফা হোসেইন, সম্প্রীতি বংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেত্রী জয়শ্রী ব্যানার্জী, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক তৌফিক হাসান ময়না, একুশে টেলিভিশনের ভারপ্রাপ্ত অনুষ্ঠান প্রধান সাইফ আহমেদসহ অন্যরা।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও সম্প্রীতি বাংলাদেশের যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, নির্বাচন এলেই সাম্প্রদায়িক নানা দাঙ্গা আমরা দেখতে পাই। ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত নির্বাচন পরবর্তী হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যেসব হামলা-ধর্ষণ হয়েছে, তা ইতিহাসের কালো অধ্যায়। আসন্ন দ্বাদশ নির্বাচনে আমরা কোনো সাম্প্রদায়িকতা চাই না। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আর কোনো সাম্প্রদায়িকতাকে আমরা মেনে নেব না।

তিনি বলেন, দ্বাদশ নির্বাচনকে ঘিরে দেশি-বিদেশি নানা অপশক্তি তৎপর। তারা দেশে আবারও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে চায়, আমাদেরকে সেটা রুখে দিতে হবে।

সম্প্রীতি বাংলাদেশের আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সাম্প্রদায়িক অপশক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এগুলোকে প্রতিহত করতে হবে। আমরা যদি একত্রে সবাই মিলে দাঁড়াতে পারি, তাহলে তাদেরকে আমরা রুখতে পারব। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে, যতোই ষড়যন্ত্র থাকুক সেগুলো ছিন্ন করে বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িকতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। সব ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করে শান্তি-সমৃদ্ধির দিকে আমাদের এগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, আমরা বলেছি, ২০০১ সালের বাংলাদেশ আর দেখতে চাই না। ইসিকে বলেছি শক্তভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। ওই সময়ে যে ভয়াবহতা, নৃশংসতা, যে অত্যাচার হয়েছিল, তা প্রায় একাত্তর সালকে মনে করিয়ে দেয়। সে ব্যাপারগুলো আমরা বাংলাদেশ থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে চাই।

অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারা বলেন, ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখে দিতে সমাজের সর্বস্তরে ঐক্য প্রয়োজন। ধর্মের দোহাই দিয়ে যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ জলাঞ্জলি দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। দেশে কালো অশুভ শক্তির ষড়যন্ত্র এখনো বন্ধ হয়নি।