মলাট বন্দি হলো ঐতিহ্যবাহী জামদানির নকশা 

নকশার বিকৃতি ও বিলুপ্তির হাত থেকে জামদানি রক্ষায় আদি জামদানির নকশা নিয়ে তৈরি হলো একটি প্রকাশনা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বইটি প্রকাশ করেছে সেবা নারী ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। এর মধ্য দিয়ে জামদানির বিলুপ্ত নকশাগুলো যেমন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। 

তেমনি নকল ও বিকৃতি থেকেও রক্ষা পাবে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি রক্ষা পাবে বলে জানিয়েছেন প্রকাশনার সাথে সংশ্লিষ্টরা। শুক্রবার জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্স অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘আদি জামদানি নকশা’ শিরোনামের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।

জামদানি দেশের বস্ত্রশিল্পের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য এবং আভিজাত্যের প্রতীক। এটি কার্পাস তুলা থেকে তৈরি এক ধরনের সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র। জামদানি বলতে মূলত জামদানি শাড়িকেই বোঝানো হয়। নকশা ও অনন্য বুনন পদ্ধতির কারণে অন্য শাড়ির চেয়ে আলাদা এই শাড়ি।

ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো এবং সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়নে জামদানি শিল্প বেশি দেখা যায়। কালের আবর্তে জামদানি শিল্প একসময় প্রায় বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। তবে বর্তমানে শাড়িপ্রেমী বাঙালি নারীর প্রিয় পোশাকের তালিকার শীর্ষে রয়েছে জামদানি।

বস্ত্রে ফুটিয়ে তোলা ফুল–লতাপাতার মতো সাধারণ নকশাও যে গুপ্তবিদ্যা হতে পারে, তার বড় উদাহরণ হতে পারে জামদানি। শত শত বছর ধরে জামদানি বোনা হচ্ছে, কিন্তু এর নকশা আঁকা থাকে না। সেই নকশা সংরক্ষিত থাকে তাঁতির স্মৃতির মহাফেজখানায়। অথচ এতে রয়েছে অঙ্কের জটিল হিসাব–নিকাশ।

বংশপরম্পরায় এই নকশাগুলো প্রবাহিত হতে থাকে যুগ যুগ ধরে। ঠিক কবে থেকে এবং কীভাবে এই নকশা তৈরি হলো তার কোন সঠিক ইতিহাস না থাকলেও, জামদানির শাড়ির খোঁজ পাওয়া যায় পাঁচশ বছরের আগের ইতিহাসে। মনে করা হয়, ঢাকা যখন সূতির রাজধানী ছিলো, তখন থেকেই জামদানির বুনন শুরু। 

এখন বাজার যেসব জামদানি পাওয়া যায়, সেগুলো নকশাই দেড় থেকে দুশ’ বছরের পুরোনো। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নিজেদের স্মৃতিতেই এই নকশা ধরে রেখেছেন জামদানি শিল্পীরা। জামদানির এই নকশা বরাবর ছিলো স্মৃতি ও শ্রুতি নির্ভর। গুপ্তবিদ্যার মতো এমন জটিল হিসাবের অন্দরের খবর নেয়ার আগ্রহ আছে অনেকেরই।

সময়ের বাঁকে বাঁকে শিল্পীদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এমন কতো নকশা যে চিরতরে হারিয়ে গেছে সেটি জানারও উপায় নেই। এবার হারিয়ে যাওয়া যাওয়া তেমনি নকশা নিয়ে তৈরি হলো বই। জামদানির ঐতিহ্যবাহী বয়ন শিল্পের নকশা কলুষিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে সেবা নারী ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এ বইটি প্রকাশ করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের প্রধান পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী আইউব আলী। তিনি বলেন, জামদানিকে টিকিয়ে রাখতে জামদানির ঐতিহ্যকে তুলে ধরা এবং বয়ন শিল্পীদের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন জরুরি। বয়নশিল্পকে পরিবেশবান্ধব করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। 

তিনি বলেন, ১৭ প্রকার মসলিনের মধ্যে একটি জামদানি। নারায়ণগঞ্জের তাঁতিরা আদি মসলিনের বংশধর হলেও তাদের জীবনমানের উন্নতি হয়নি। তাই জামদানি রক্ষায় আরও সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আর সেবা নারী ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সাইদা রোকসানা খান বলেন, আমরা পিকেএসএফের একটি প্রকল্পের আওতায় এই বইয়ে ২০০ বছরের জামদানির ঐতিহ্য ও নকশা তুলে ধরেছি এই বইয়ে। 

তিনি জানান, সেবার লক্ষ্য কেবল জামদানিকে টিকিয়ে রাখা নয়, বরং জামদানির ঐতিহ্যকে তুলে ধরা এবং বয়ন শিল্পীদের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন, বয়ন শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করা। আর এই ঐতিহ্যবাহী বয়ন শিল্পকে কলুষিত হওয়া থেকে রক্ষা করা। 

এসইপি প্রজেক্টের আওতায় জামদানি বয়ন ও শিল্পীদের উন্নয়নে নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ঋণদান, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম, জামদানি শাড়ি বিক্রয় ও প্রচার কেন্দ্র, পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয় এই কার্যক্রমে রয়েছে।

জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্রশেখর সাহার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক সচিব ও জাতীয় জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, কারুশিল্প পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শেখ সাইফুর রহমান প্রমুখ।