সনদ জালিয়াতির ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর খান।
গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ তাকে দু’দিনের সময় দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। এসময়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ পাবেন তিনি। যদি তিনি সেটা না করেন ও সনদ জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ মেলে তবে চেয়ারম্যান আলী আকবরের বিরুদ্ধেও আইনানুগ পদক্ষেপ নেয়া হবে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশপ্রধান হারুন অর রশীদ এসব জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সনদ জালিয়াতির ঘটনায় ডিবি কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় প্রতিষ্ঠানটির সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর খানকে। পরে ডিবি কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের হারুন অর রশীদ বলেন, আগারগাঁওয়ের পীরেরবাগ, পাইকপাড়ায় সিস্টেম এনালিস্ট শামসুজ্জামানের বাসায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিলো। সেখানে তিনি জাল সনদের কারখানা তৈরি করেছিলেন। তিনি কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে কী করে সার্টিফিকেটের হাজার হাজার কাগজ এনে জালিয়াতি করতেন।
তিনি বলেন, সনদ জালিয়াতির ঘটনায় আমরা ছয় জনকে গ্রেপ্তার করেছি। এরমধ্যে পাঁচ জন সব দোষ স্বীকার করে এ ঘটনায় আর কারা জড়িত ও দায় রয়েছে সে সম্পর্কে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
হারুন বলেন, সদ্য ওএসডি হওয়া চেয়ারম্যানের স্ত্রীকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তিনি জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে, তিনি সিস্টেম এনালিস্ট শামসুজ্জামানের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। শামসুজ্জামান ও কারিগরির চেয়ারম্যানের স্ত্রী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা জানতে চেয়েছি, কীভাবে সার্টিফিকেট চুরির পর ওয়েবসাইটের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে আপলোড করে অনিয়ম করা হয়েছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস? তিনি একজন চেয়ারম্যান। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন। সেই প্রতিষ্ঠান থেকে কাগজ নিয়ে যাচ্ছে, সিসিটিভি আছে, তারা দেখছেন। তবু এই জালিয়াতি হলো!
আবার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সার্টিফিকেটগুলোতে স্বাক্ষর করে গেছেন মাসের পর মাস। কলেজগুলোর পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে সার্টিফিকেটে স্বাক্ষর করার কথা, তিনি সেটি করেননি।
হারুন বলেন, এই ঘটনাগুলো অবহেলায় চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক করেছেন— নাকি স্বপ্রণোদিতভাবে করেছেন সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আপনারা জেনেও কেন ব্যবস্থা নিলেন না? তখন চেয়ারম্যান ডিবিকে বলেছেন, আমাদের লোকবল কম ছিল। নজরদারি সম্ভব হয়নি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সার্টিফিকেট কেনাবেচা হচ্ছে, সার্টিফিকেট বানানোর পর কারিগরি বোর্ডের ওয়েবসাইটে আপলোড হচ্ছে। মানুষ সার্টিফিকেট, প্রতিষ্ঠান কিনছে- এসব জানার পরও দায় এড়াতে পারেন কিনা? তখন চেয়ারম্যান বলেন, সেই দায় ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত? অবহেলা নাকি পাক্ষপাত? স্ত্রীর বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি সেটি জানতেন না দাবি করেছেন।
এদিকে ডিবি কার্যালয় থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের আলী আকবর খান বলেন, আমার স্ত্রী সেহেলি পারভীনের সার্টিফিকেট বাণিজ্যের ঘটনায় আমি কিছুই জানি না।
সনদ ও নম্বরপত্র জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে আলী আকবরের স্ত্রী সেহেলা পারভীনকে রোববার গ্রেপ্তারের খবর দেয় ডিবি। নম্বরপত্র ও সনদ জালিয়াতির বিরুদ্ধে সম্প্রতি ডিবির অভিযানে সেহেলাসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই চক্রের সদস্যরা অর্থের বিনিময়ে জাল সার্টিফিকেট ও মার্কশিট কেনাবেচায় জড়িত ছিলেন বলে সাংবাদিকদের জানান ডিবি প্রধান হারুন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জাল সার্টিফিকেট বিক্রির কথা স্বীকারও করেছেন সেহেলা পারভীন।
আর এই চক্রটি গত কয়েক বছরে পাঁচ হাজারের বেশি জাল সার্টিফিকেট ও মার্কশিট বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করেছে বলেও জানান তিনি।
স্ত্রী গ্রেপ্তারের পরই কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এক অফিস আদেশে আলী আকবর খানকে অব্যাহতির কথা জানানো হয়। তাকে সংযুক্ত করা হয়েছে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে।
জালিয়াতি চক্রে স্ত্রী জড়িত থাকায় স্বামী কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর খানকে নিয়ে সন্দেহ বাড়তে থাকে গোয়েন্দাদের। তাই তাকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দা কার্যালয়ে তলব করা হয়।
সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর সাংবাদিকদের বলেন, একটি ঘটনা ঘটেছে, এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। এক্ষেত্রে আমরা লজ্জিত ও দুঃখিত।
স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমার স্ত্রীর বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। গোয়েন্দা সংস্থা কী তথ্য পেয়েছে, তাও জানি না।
সংবাদ সম্মেলনে হারুন বলেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নজিরবিহীন জাল-জালিয়াতির বিষয়টি ইতিহাসে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য কলঙ্কিত ও কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করার মতো ঘটনা৷ আমি মনে করি, কারিগরির চেয়ারম্যান দায় এড়াতে পারেন না। কোনও সুযোগ নেই। আমরা এখন দেখবো, তিনি আসলে সনদ বিক্রির বিষয়টি জানতেন কিনা? তার তো জানার কথা। তিনি তো আসল সার্টিফিকেট বিক্রির মাধ্যমে শিক্ষা ও জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছেন। একটা মানুষ পরিশ্রম করেও ভালো রেজাল্ট করতে পারছে না, সেখানে পড়াশোনা না করেই টাকা দিয়ে আসল সার্টিফিকেট কিনে নিচ্ছে। এটা কাঙ্ক্ষিত না।
ডিবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সনদ জালিয়াতির ঘটনায় তার দায় সম্পর্কে সঠিক ব্যাখ্যা দিতে হবে। প্রয়োজনে তাকে এক-দুদিনের সময় দেবো। তিনি যদি সঠিক ব্যাখ্যা দিতে না পারেন আর আমরা যদি তার সংশ্লিষ্টতা বা অনৈতিক যোগসাজশের তথ্য-প্রমাণ পাই তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।