জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে হয়রানি, মানহানি এবং ব্যবসা বন্ধ করে দিতে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন নারী উদ্যোক্তা রোবাইয়াত ফাতিমা তনি।
মনগড়া অভিযোগকারী তৈরি করে জরিমানা, আইন অমান্য করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান এবং জরিমানা দেয়ার পরেও পরেও তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিকে ‘ধ্বংস করার পাঁয়তারা’ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রোবাইয়াত তানির অভিযোগ নিয়ে চলতি সপ্তাহেই সংবাদ সম্মেলন করা হবে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান।
তনি দাবি করেছেন, একটি অবৈধ অভিযোগে ও অপর একটি ভুয়া অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে তাকে। একই সঙ্গে পুলিশ প্লাজায় অবস্থিত তার প্রতিষ্ঠান সানবিসের প্রধান শোরুম বেআইনিভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া তার অফিস ও অন্যান্য শোরুমে প্রতিদিন পুলিশ নিয়ে হানা দিচ্ছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার মন্ডল।
এজন্য নিজের ও ব্যবসার সুরক্ষায় ভোক্তা অধিদপ্তরের এমন তৎপরতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক তনি। এর আগে অধিদপ্তরকে আইনি নোটিশ দেন তিনি।
তনির পাঠানো উকিল নোটিশ ও রিট পিটিশন থেকে জানা গেছে, গত ১৪ মে সানবিসকে দুটি অপরাধের দায়ে ৫০ হাজার ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
লুবনা ইয়াসমিন নামের এক নারীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ইন্দ্রানী রায়। লুবনা ইয়াসমিন নামের ওই ক্রেতা সানবিস থেকে একটি পোশাক কিনেছিলেন ৯ ফেব্রুয়ারি। এর ৫৩ দিন পর ৩ এপ্রিল ওই নারী ভোক্তা অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন। পরে ১২ মে সানবিসের প্রধান শোরুমে অভিযান চালিয়ে সেটি সিলগালা করে দেন সহকারী পরিচালক জব্বার মন্ডল।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৬০ ধারা অনুযায়ী অধিদপ্তরে অভিযোগ দায়ের করতে হয় ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে। কিন্তু লুবনা ইয়াসমিন অভিযোগ করেছেন ৫৩ দিন পর। ফলে তার অভিযোগ আমলে নেয়ার বৈধতা হারিয়েছেন। এই ৫৩ দিন তিনি ওই কাপড় ব্যবহার করে নষ্ট করেছেন কি না সেটিও নিশ্চিত নয় কেউ। কিন্তু এমন অভিযোগ আমলে নিয়ে ৪৫ ধরা মতে সর্বোচ্চ শাস্তি ৫০ হাজার টাকা সানবিসকে জরিমানা করা হয়।
এমন অবৈধ অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া আইনের প্রয়োগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে মনে করছেন তনির আইনজীবী সৈয়দ খালেকুজ্জামান অরুন।
অন্যদিকে মিথ্যা বিজ্ঞাপনের অভিযোগে ৪৪ ধারায় সানবিসকে দ্বিতীয় দফা জরিমানা (দুই লাখ টাকা) করেন ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার মন্ডল। দ্বিতীয় জরিমানার টাকা আদায়ের রশিদে অভিযোগকারী হিসেবে রাজু নামের এক ব্যক্তিকে দেখানো হয়েছে। কিন্তু রাজু নামে কোনো ব্যক্তি সানবিসের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি বলেও জানান তনি। এমনকি এই অভিযোগের বিষয়ে সানবিসকে কোনো নোটিশ দেয়া হয়নি বা শুনানিও হয়নি।
লুবনা ইয়াসমিনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সানবিসের মালিক তনিকে তলব করেন ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তা ইন্দ্রানী রানি। কিন্তু সেই তলবের শুনানিতে অযাচিতভাবে হাজির হন ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার মন্ডল।
তানির অভিযোগ ভুয়া অভিযোগকারীর নামে নোটিশ বা শুনানি ছাড়াই বেআইনিভাবে দুই লাখ জরিমানা করেন।
তার আইনজীবী অভিযোগ করে বলেন, দুটি জরিমানার ক্ষেত্রেই তনিকে কোনো আদেশের কপি দেয়া হয়নি। যা রীতিমতো বেআইনি। শুধু জরিমানার টাকা গ্রহণের রশিদ দেয়া হয়।
এমন ‘অবৈধ ও ভুয়া’ অভিযোগের প্রেক্ষিতে জরিমানা দিতে আব্দুল জব্বার মন্ডল রোবাইয়াত ফাতিমা তনিকে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন বলে অভিযোগ তনির। জরিমানা দিলে বিষয়টি এখানে মিটমাট হয়ে যাবে, না দিলে তনির অন্য যে ১০টি শোরুম রয়েছে সেগুলো অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেয়া হবে বলেও তাকে হুমকি দেখানো হয়।
এ বিষয়ে তনি বলেন, সহকারী পরিচালক আমাকে বলেছিলেন, জরিমানা না দিলে আপনার শোরুম আজ খুলে দেয়া হবে। না হলে অন্যান্য শোরুমে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেয়া হবে। তখন আমার ব্যবসা বাঁচাতে ওনারা যা বলেছেন তাই করেছি। কয়েকটি কাগজেও স্বাক্ষর নিয়েছে। কিন্তু ওনারা আমার শোরুম খুলে না দিয়ে টালবাহানা শুরু করে।
এদিকে তনিকে দুই দফা জরিমানা করার পর তার শোরুম খুলে না দিয়ে তনির ব্যবসা নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি করেন। পরের দিন শোরুম খুলে দিতে প্রতিশ্রুতি দিলেও তনিকে জানানো হয়, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত শোরুম বন্ধ থাকবে।
একজনকে একটি অবৈধ অভিযোগে ডেকে দুই দফা শাস্তি দেয়ার পর তদন্ত কমিটি করায় অধিদপ্তরের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তনির আইনজীবী খালেকুজ্জামার অরুন।
তিনি বলেন, আপনি যদি কোনো ঘটনা নিয়ে তদন্ত কমিটি করেন তাহলে তদন্তের আগে কীভাবে দুই দফা শাস্তি দিয়ে ফেললেন? আর শাস্তি যখন দিলেন তাহলে শোরুম বন্ধ রাখলেন কিসের ভিত্তিতে? তাছাড়া তাকে যে শাস্তি দেয়া হয়েছে তার আদেশের কোনো কপি বা শোরুম বন্ধের আদেশের কোনো কপি তাকে দেয়া হয়নি। পুরো বিষয়টি তারা বেআইনিভাবে করেছে। এজন্য তারা আদেশের কপি দেননি। যাতে তনি চ্যালেঞ্জ করতে না পারে। এখন আমরা উচ্চ আদালতের কাছে বিচার প্রার্থনা করেছি। একজন নারী উদ্যোক্তাকে এমন হয়রানি করার প্রতিকার আমরা উচ্চ আদালতে পাবো আশা করি।
এদিকে ১৩ মে জরিমানা দেয়ার পর থেকে শোরুম খুলে দিতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও জব্বার মন্ডলসহ একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেছেন তনি। শেষ পর্যন্ত কোনো সুরাহা না হওয়ায় গত ২১ মে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ আটজনকে আইনি নোটিশ পাঠান তনির আইনজীবী সৈয়দ খালেকুজ্জামান অরুন। একই সঙ্গে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করেন। আগামী দুই থেকে তিন কার্য দিবসের মধ্যে রিটের শুনানি হতে পারে বলে জানা গেছে।
আইনি নোটিশ পাওয়ার পরপরই বনানীতে অবস্থিত তনির অফিসে পুলিশ নিয়ে অভিযান চালাতে জব্বার মন্ডল। তবে অফিস বন্ধ পান। সেখানে থেকে ধানমন্ডিতে অবস্থিত সানবিস বাই তনির শোরুমে অভিযান চালাতে যান। কিন্তু সেটিও বন্ধ পাওয়াতে সানবিসের ধানমন্ডি শাখার সামনে পুলিশ বসিয়ে রাখেন জব্বার মন্ডল। ফলে শোরুম খুলতে পারেননি তনির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে চাইলে জব্বার মন্ডল কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বরেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুমতি ছাড়া কথা বলবেন না।
মহাপরিচালক এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান বলেন, চলতি সপ্তাহে সার্বিক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হবে।