বিষন্নতায় ছেয়ে আছে মাইলস্টোন ক্যাম্পাস, আতঙ্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

শোক, আতঙ্ক আর গভীর বিষণ্নতায় ছেয়ে আছে উত্তরার মাইলস্টোন ক্যাম্পাস। শিশুরা চোখের সামনে বন্ধুদের ভয়াবহ মৃত্যু দেখেছে। নিজেও মুখোমুখি হয়েছে মারাত্মক বিপদের। এসবের প্রভাবে তারা এখন গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। 

শিক্ষার্থী, অভিভাবক আর প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখের সামনে এখনও দৃশ্যমান উত্তরার মাইলস্টোন ক্যাম্পাসের ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনা। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে এক নীরব বেদনা, আতঙ্ক আর শোকের ছায়া। খেলার মাঠ থেকে শ্রেণিকক্ষ- প্রতিটি কোনায় ভিড় করে আছে কষ্টের স্মৃতি। কেউ হারিয়েছে সহপাঠী প্রিয় বন্ধু, প্রিয় শিক্ষক কেউ বা আপনজন। শুধুই চোখের নোনা জল আর বিষণ্ন বেদনা। জীবন বহমান। ভয়াবহ ঘটনা মনে আর শরীরে রেখে গেছে ক্ষত। 

কীভাবে আবার বই-খাতা হাতে ক্লাসে ফিরবে শিশুরা, সেই প্রশ্ন এখন শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ সবার। মাইলস্টোন ট্রাজেডিতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝে এখনও আতঙ্ক আর শোকের ছায়া। দেখা দিয়েছে মানসিক ট্রমা। শিশুরা উড়োজাহাজের শব্দে চমকে উঠছে। ক্লাসে ফিরতে চাইছে না।

parents-student-milestone

স্কুলের টিফিনের ঘণ্টা আর খেলার ক্লাসের ঘণ্টার জন্য দারুণ অপেক্ষা শিশুদের। দপ্তরি মামা কখন ঘণ্টা বাজাবে আর দে ছুট সবাই। এ যেন সব স্কুলের নিয়মিত দৃশ্য।

tiffin

প্রতিদিনের রুটিনের নিয়ম বাধা ক্লাস আর পড়াশোনা। এরপর কোচিং ও হোম ওয়ার্ক। এর মাঝে টিফিন পিরিয়ড এবং খেলার ক্লাস যেন মুক্তির আনন্দ, বলছিলো শিশুরা।

tiffin-paly

পাঠ্যবই-ক্লাস সবই করতে তারা রাজী। শুধু চায় এর পাশাপাশি নিজের মত অন্যকিছু। সেখানে বাবা মা বড়ই অবুঝ, তাদের মতে। বাবা মা শুধু পড়তে বলে । কিন্তু তারা ড্রয়িং করা, কার্টুন দেখতে আর খেলতে চায় । পড়াশোনা করবে সাথে সাথে।

student-school

পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ আর মাঠের অভাব। তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে শিশুদের সহশিক্ষা কার্যক্রম কমে যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সফলভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিশুরা নিজেদের উপর আত্মবিশ্বাসী হতে শেখে। মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীদের ভয় আর আতঙ্ক কাটাতে এসব স্কুলে সহশিক্ষা কার্যক্রম আনা প্রয়োজন। শিশুর চাওয়াকেই গুরুত্ব দিতে হবে সবার আগে। একটু ভিন্নভাবে পাঠদান দারুণ মনোযোগী করে শিশুদের। সহশিক্ষা কার্যক্রমের উপর জোর দিতে অভিভাবকদের সহায়তা প্রয়োজন।

সুমনা বিশ্বাস, প্রধান শিক্ষিকা, নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়।

হারমান মেইনার স্কুল এন্ড কলেজ অধ্যক্ষ রাফিয়া আক্তার তার স্কুলের শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার কম হওয়ার জন্য বড় কারণ মনে করেন স্কুলের বড় মাঠ। বাচ্চারা খেলতে ভালোবাসে এই মাঠ তাদের স্কুলে আসতে উৎসাহী করে বলে তিনি মনে করেন।একই সাথে স্কুলে চালু থাকা ইনডোর গেমস বিশাল লাইব্রেরি ক্লাব সহশিক্ষা কার্যক্রম দারুণ ভাবে শিক্ষার্থীদের মানসিক গঠনে সহায়তা করছে।তাছাড়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিশুরা দলগতভাবে কাজ করতে শেখে এবং অন্যদের সাথে সহযোগিতা করতে উৎসাহিত হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিশুরা অন্যদের সাথে মিশে যেতে শেখে এবং সামাজিক দক্ষতা অর্জন করে।

রাফিয়া আক্তার, অধ্যক্ষ, হারমান মেইনার স্কুল এন্ড কলেজ।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় আছেন শিক্ষক- অভিভাবকরাও। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউেটর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান এমন পরিস্থিতিতে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অনিদ্রা, খিটখিটে মেজাজসহ দেখা দিতে পারে অনেক কিছু। বিশেষ যত্ন নিতে হবে সকলের। নিতে হবে বিশেষ মানসিক যত্ন।

অধ্যাপক ডা.মো. মাহবুবুর রহমান।

বড় কোনো দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের মানসিকভাবে ট্রমাটাইজড হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে সময়মতো কাউন্সেলিং না পেলে এই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলছেন, এখনই যত্ন না নিলে বিষয়টি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলছিলেন, খেলাধুলা শিশুদের সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। শিশুরা অন্যদের সাথে মিশে কাজ করতে, সহযোগিতা করতে এবং নেতৃত্ব দিতে শেখে

মেন্টাল হেলথ ফাস্ট এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি লিড মনিরা রহমান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের ভয় কাটাতে একাডেমিক চাপ নয় তাদের মত করে সাজাতে হবে পাঠ্যক্রম। ট্রমা কাটাতে কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি স্কুলে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আর বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে বজায় রাখা দরকার বলে তার মত মনিরা রহমানের। খেলাধুলা, আঁকা, গল্প লেখা আর গান শোনার মতো সৃজনশীল কাজ শিশুর মনের চাপ কমায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পড়াশোনার পাশাপাশি মাইলস্টোনের শিশুদের সঠিক সহশিক্ষা, শারীরিক ও মানসিক সেবা না দিলে পরবর্তীতে জটিল মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তাই শিশুকে তার অনুভূতি প্রকাশের নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য উপায় তৈরি করে দিতে  হবে। 

মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরলেও থেকে যাবে অজস্র আতঙ্কের দাগ। সেটা কাটানোর বিকল্প উপায় কি তা নিয়ে কথা হয় সাবেক জাতীয় দলের ফুটবলার রেহানা পারভীনের সাথে । তার মতে, খেলাধুলা হলো যে কোন ট্রমা কাটানোরে সবচেয়ে বড় ওষুধ। খেলাধুলা শিশুদের মনন বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা নতুন জিনিস শেখে, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক দক্ষতাও অর্জন করে। খেলাধুলা শিশুদের ভয় কাটিয়ে উঠতে এবং আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা নতুন কিছু শিখতে পারে, সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং সামাজিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এই প্রক্রিয়াগুলো তাদের ভয় কাটিয়ে উঠতে এবং আরও আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে।

মেহেদি মাসুদ

শান্তা মরিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন এ্যান্ড ডিজাইন বিভাগের ফ্যাকাল্টি মেহেদি মাসুদের মতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিশুদের সামগ্রিক বিকাশে অপরিহার্য। এটি তাদের সৃজনশীলতা, সামাজিকীকরণ, এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা তৈরিতে সহায়তা করে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিশুরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও, এটি তাদের মধ্যে সহনশীলতা, সহযোগিতা, এবং নেতৃত্ব প্রদানের গুণাবলি বিকাশে সহায়ক। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রমা কাটাতে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক চাপ নয়, তাদের গল্প আর খেলাধুলার বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে আনতে হবে।

মনিরা রহমান

শিশুদের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে, স্বাভাবিক রাখতে হলে প্রথমেই তাদের অনুভব করাতে হবে কান্না-ভয় ও দুর্ঘটনা এগুলো স্বাভাবিক, জীবনেরই অংশ। শিক্ষার্থীদের আবারও ঘুরে দাঁড়াতে প্রয়োজন যত্ন, সহমর্মিতা আর পরিকল্পনা।

কথা হচ্ছিলো মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা লে. কর্নেল (অব.) নুরুন নবীর সাথে। জানালেন মানসিক সেবা স্বাস্থ্য সেন্টার খোলা হয়েছে স্কুলে । স্কুল ঘুরে দেখা গেল শুধু ছাত্র ছাত্রী নয় অভিভাবকসহ শিক্ষকরাও এই সেবা নিচ্ছেন।

লে. কর্নেল (অব.) নুরুন নবী, প্রতিষ্ঠাতা, মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজ।

সব হারিয়ে চোখের জলে আবারও হয়ত নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখবে মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীরা। হয়ত সেই গল্পে থাকবে স্বপ্ন আর দৃঢ় সংকল্পের কথাও।ঝরে যাওয়া ফুলগুলো শান্তিতে থাক। আর শোক,আতঙ্ক আর বিষণ্নতা কাটিয়ে মাইলস্টোনের বাগানের দুরন্ত ফুলেরা হেসে উঠুক। এই শিশুদের আর কখনো এমন দৃশ্যের সম্মুখীন না হোক এমনটাই প্রত্যাশা সবার।