রাজধানীর উত্তরায় ইলেকট্রনিকস মেরামতের টিনের চালওয়ালা একটি ছোট দোকান। কিন্তু সেই দোকানের ব্যাংক হিসাবেই মাত্র চার দিনে লেনদেন হয়েছে দেড় কোটি টাকা। বিদেশি কার্ডে শত শত লেনদেন, জাল বিক্রয় রশিদ আর এক চীনা ব্যবসায়ীর রহস্যময় সম্পৃক্ততা। সব মিলিয়ে উঠেছে প্রশ্নের পাহাড়। এই অস্বাভাবিক টাকা লেনদেনের উৎস কী? কে বা কারা আছে এর পেছনে?
সফিকুল ইসলাম। উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর রোডের এসএমএস রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর মালিক তিনি। ছোট এই দোকানটি একক মালিকানাধীন ইলেকট্রনিক্স পণ্য বিক্রয় ও মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান।
দোকানটি দেখে এর পুঁজি বা লেনদেন সম্পর্কে যদি একটি ধারণা দিতে বলা হয় তাহলে কতই বা হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?
দশ লাখ, বিশ লাখ, ত্রিশ লাখ! নাহ, আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। সম্প্রতি এই মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানের ইউসিবি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে প্রায় এক কোটি পঞ্চাশ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে মাত্র চার দিনে।
এক কোটি পঞ্চাশ লাখতো দূরের কথা ১০-২০ লাখ টাকাও চার দিনে লেনদেন হয়েছে এমন কোন দৃষ্টান্ত নেই এই প্রতিষ্ঠানের। অথচ হঠাৎ এত টাকা কোথা থেকে আসলে এই মেকানিকের দোকানে?
ইউসিবি ব্যাংক বলছে, সপ্তাহব্যাপী ৫৪৭টি বিদেশি কার্ড ব্যবহার করে ৬৬৩টি লেনদেনের মাধ্যমে টাকাগুলো আসে এবং পজ মেশিন ব্যবহার করে সেই টাকার বেশিরভাগ তুলেও নেয় শফিকুল। এরপর ইউসিবি ব্যাংক শফিকুলের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে এবং আনুষঙ্গিক কাগজপত্র চেয়ে চিঠি দেয়।
শফিকুলের এই টাকার উৎস কি, জানতে চায় একাত্তর অনুসন্ধান। তার জবাব শুনে কিছুটা খটকা লাগলো। এই ছোট্ট দোকানের দেড় কোটি টাকার এসি বিক্রি করার সক্ষমতা আছে? প্রমাণ করার জন্য শফিকুল আমাদের বিক্রয় রশিদ দেখাতে চান।
রশিদ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এগুলো ভিন্ন ভিন্ন দিনের হলেও ক্রমিক নম্বরের ধারাবাহিকতা একই। তার মানে ব্যাংকের কাছে দাখিলের জন্য এসব জাল রশিদ তৈরি করা হয়েছে। প্রশ্নের মুখে শফিকুল এবার স্বীকার করলেন যে, তার এই অ্যাকাউন্টটি ব্যবহার করে চীনের এক ব্যবসায়ী। যিনিই বিদেশ থেকে টাকাগুলো এনেছে। বিনিময়ে মোটা অংকের টাকার পাওয়ার শর্ত।
শফিকুল ইসলাম যে ব্যবসায়ীর কথা বলছেন তার নাম ইয়ান। চামড়াজাত পণ্য তৈরিসহ বাংলাদেশে চীনের বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদারিও করে ইয়ান। উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়িটি পুরোটা ভাড়া নিয়েছেন ইয়ান। সেখানে গিয়ে পাওয়া গেল না ইয়ানকে। ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
এবার ব্যাংকে যাবার পালা। ইউসিবি ব্যাংকের সোনারগাঁ জনপথ ব্রাঞ্চে মেকানিক শফিকুল ইসলামের অ্যাকাউন্ট। যে অ্যাকাউন্টে প্রায় দেড় কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে। ব্যাংকের কাছে জানতে চাই, সন্দেহজনক হওয়ার পরও কেন টাকা উত্তোলনে কোন প্রশ্নের মুখে পরেননি শফিকুল।
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলতে বললেন। কিন্তু এখানে কি ব্যাংকের কোন দায় নেই? অনুসন্ধানে জানা যায়, এসএমএস রেফ্রিজারেটরের মালিক শফিকুলের আপন ভাই ইউসিবি ব্যাংকের বনানী শাখায় কর্মরত। অভিযোগ আছে, এই অবৈধ লেনদেনের ক্ষেত্রে শফিকুলের ভাই তাকে সহযোগিতা করেছে।
আবারও সেই চীনা ব্যবসায়ী ইয়ানের খোঁজে উত্তরায়। বাড়ির সামনে যেতেই দেখা হলো তার স্ত্রীর সাথে। জানতে চাইলাম ইয়ান আছে কিনা? কিন্তু কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মুখ লুকিয়ে দ্রুত সটকে পরেন। একটু পর ইয়ানের একজন বাংলাদেশি কর্মচারী আসেন বাড়িতে। তিনিও এ বিষয়ে কোন কথাই বললেন না।
ইয়ানের সাথে কাজ করে এমন চায়নার কয়েকজন নাগরিক সাথে দেখা হলো। উত্তরার পথে চলতে চলতে দেখা হয়ে গেল ইয়ানের সাথে। কিন্তু কোন প্রশ্নেরই উত্তর না দিয়ে ইশারায় ক্যামেরা বন্ধ করতে বললেন।