‘তোমার সাথে পথ হেঁটেছি, তোমার স্বপ্নে বুক বেঁধেছি’- এই প্রগাঢ় ভালোবাসা আর দীপ্ত অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াপ্রেমী ও নির্ভীক সংগঠক সৈয়দ উপল বখতের স্মরণসভা।
শনিবার, বিকেল সাড়ে পাঁচটায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে তাঁর সুহৃদ ও সহযোদ্ধাদের যৌথ উদ্যোগে এক আবেগঘন পরিবেশে এ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।
শৈশব থেকে রাজপথ, এক মানবিক ও সংগ্রামী জীবন: উপল বখতের শৈশবের সূচনা হয়েছিল ‘কচি-কাঁচার মেলা’র মতো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের হাত ধরে, যেখানেই প্রথম তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার বিকাশ ঘটে। পরবর্তীতে মানবিক ও সাম্যের সমাজ গড়ার মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন রাজপথের অগ্রসৈনিক ও অকুতোভয় তারুণ্যের প্রতীক। মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ও সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেননি।
তবে রাজনীতি তাঁর কাছে শুধু শুষ্ক মতাদর্শ ছিল না; তা ছিল মানুষের প্রতি নিবিড় ভালোবাসা, মানবিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন। বন্ধুদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ ছিল ঈর্ষণীয়। পরম নির্ভরতার প্রতীক হয়ে বন্ধুদের যে কোনো বিপদে ও দুঃসময়ে নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে পাশে দাঁড়াতেন তিনি। অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে জীবনের অনেকটা সময়ই ব্যয় করেছেন প্রয়াত উপল।
আবেগঘন শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণ: স্মরণসভার সূচনায় প্রয়াত সৈয়দ উপল বখতের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর মণজু আরার কণ্ঠে পরিবেশিত হয় সূচনা সংগীত। কনক রাব্বি পাঠ করেন প্রয়াতের জীবন ও কর্মের ওপর লেখা স্মারকলিপি। অনুষ্ঠানে তাঁর রঙিন জীবন, রাজনীতি, লড়াই-সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও বন্ধুত্বের নানা মুহূর্ত নিয়ে একটি বিশেষ স্লাইড শো প্রদর্শন করা হয়।
স্মরণসভায় সমবেত বক্তারা বলেন, উপল বখতের অকাল প্রয়াণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু তাঁর প্রদর্শিত আদর্শ, সাহসিকতা, পরম বন্ধুত্ব এবং মানুষের জন্য ভালোবাসা চিরকাল আমাদের পথ দেখাবে।
স্মরণসভায় স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, ডা. মোজাম্মেল হক, ডা. শরফুদ্দিন আহমেদ, রুস্তম আলী খোকন, মো. কাইয়ুম খান, শাহরিয়ার পারভীন কাকলী, রাশেদ লতিফ, শহীদুল ইসলাম লিটন, শেখ মো. আক্তার জামান, কাজী রকিবুল হাসান, প্রকৌশলী সৈয়দ জাকির হোসেন, জেষ্ঠ সাংবাদিক আরিফ রহমান শিবলী, সেলিনা আহমেদ এনা, মোহাম্মদ মহসিন, আনোয়ারুল হক এবং উপল বখতের পিতা সৈয়দ দীদার বখত। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মিলন কিবরিয়া ও এ টি এম তাহমিদুজ্জামান।
প্রয়াত উপলের বাবা এবং সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য সৈয়দ দিদার বখত যখন বক্তব্য দিতে উঠেন, তখন পুরো স্মরণসভায় এক মর্মস্পশী দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। বাবা হিসাবে ছেলের স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বারবার আবেগে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন। এ পর্যায়ে উপলের পুরো পরিবারকে তিনি মঞ্চে ডেকে নেন এবং উপলের সহধর্মিনী, দুই মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে।
সুর, কবিতা ও অশ্রুসজল মুহূর্ত: স্মরণসভার সাংস্কৃতিক পর্বটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী। উপল বখতের সহধর্মিণী ফাহমা নাদিয়া আনসারী রুমু কণ্ঠে তুলে নেন বিরহের সুর, ‘সে চলে গেল, বলে গেল না, সে কোথায় গেল ফিরে এল না’। বাবার স্মরণে গান পরিবেশন করেন তাঁর কন্যা সৈয়দা অর্চিতা হাশেমি। জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত ‘বোধ’ কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান তৈমুর চৌধুরী।
সবচেয়ে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় যখন উপল বখতের একমাত্র পুত্র সৈয়দ আরান বখত হাশেমি তাঁর বাবাকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা পাঠ করেন। তাঁর কণ্ঠের প্রতিটি উচ্চারণে মিলনায়তনে উপস্থিত সবার চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে।
এরপর জনপ্রিয় মার্কিন লোকগায়ক পিট সিগারের গান হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অনুবাদে ‘ফুলগুলি কোথায় গেল’ পরিবেশন করেন গণসংগীত শিল্পী লাকী আক্তার। পরিশেষে, মিলনায়তনে সমবেত সবার কণ্ঠে সমবেত সুর “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে” পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এক প্রিয় মানুষকে বিদায় জানানোর এই অশ্রুসজল সন্ধ্যা। সৈয়দ উপল বখত আজ শারীরিক রূপে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সুবাসিত স্মৃতি অম্লান হয়ে থাকবে প্রতিটা সহযোদ্ধা ও সুহৃদের হৃদয়ে।