সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কারের দাবি নাগরিক সমাজের

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনীতে নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মৌলিক অধিকারভিত্তিক সংস্কারের জোর দাবি জানানো হয়েছে। ঢাকার একটি গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার ও সংগঠন করার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে আইনটি সংশোধনের আহবান জানান।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নট-ফর-প্রফিট ল’ (আইসিএনএল)-এর উদ্যোগে রাজধানীর একটি হোটেলে “নাগরিক পরিসরের সুরক্ষা: বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন নিয়ে নাগরিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি” শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে মানবাধিকারকর্মী, ডিজিটাল অধিকার বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন খাতের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সুইডিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার (সিডা) সহায়তায় এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

আলোচনায় মূল বক্তব্য ও খসড়া আইনের আইনি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন আইসিএনএলের জ্যেষ্ঠ আইন উপদেষ্টা ও ডিজিটাল অধিকার কর্মসূচির সমন্বয়ক জ্যাকারি ল্যাম্পেল।

আইসিএনএলের বিশ্লেষণে বলা হয়, সরকার গণমাধ্যম ও সম্পাদকদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করলেও নাগরিক সমাজের সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার সুযোগ এখনও সীমিত। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বিচারিক তদারকি ছাড়াই অনলাইনে কনটেন্ট অবরুদ্ধ বা অপসারণের মতো ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

গোলটেবিল আলোচনা থেকে উত্থাপিত প্রধান সুপারিশসমূহ:

২৫ ও ২৬এ ধারা বাতিল: প্রস্তাবিত আইনের ২৫ ও ২৬এ ধারায় ‘মানহানি’, ‘অপমান’, ‘হয়রানি’, ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানোর মতো বিষয়গুলোকে অস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বাধীন ও বৈধ বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার এবং আইনের অপপ্রয়োগের ঝুঁকি বাড়ে। তাই এ দুটি ধারা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানানো হয়।

সংগঠন বা গণমাধ্যমের ওপর কঠোর শাস্তি রোধ: খসড়ার ২৯(৩) ধারা অনুযায়ী শাস্তিস্বরূপ গণমাধ্যম বা নাগরিক সংগঠনের নিবন্ধন বাতিলের যে বিধান রাখা হয়েছে, তা পরিহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করা কেবল সর্বশেষ চরম পদক্ষেপ হওয়া উচিত।

বিচারিক তদারকি নিশ্চিতকরণ: অনলাইনে তথ্য বা কনটেন্ট অবরুদ্ধ করার ক্ষেত্রে স্বাধীন বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করা এবং আপিল নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা পুনর্বহালের তাগিদ দেওয়া হয়।

সুরক্ষা বিধান ও জনস্বার্থ রক্ষা: সাংবাদিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় স্পষ্ট বিধান রাখা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশকারীদের (উইসেলবোয়ার) আইনি সুরক্ষা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

সব পক্ষের সাথে আলোচনা: আইন চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দল, সংখ্যালঘু ও প্রভাবিত জনগোষ্ঠীসহ নাগরিক সমাজের সকল স্তরের সঙ্গে উন্মুক্ত ও অর্থবহ পরামর্শ প্রক্রিয়া চালুর আহ্বান জানান অংশগ্রহণকারীরা।

আইসিএনএল মনে করে, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত লক্ষ্য হলেও সেটিকে অবশ্যই নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।