সুগন্ধার পাড়ে ও বুকে প্রিয়জনকে খুঁজে ফিরছেন স্বজনরা

লঞ্চে আগুন লাগার পর সুগন্ধা নদীতে লাফিয়ে পড়াদের এখনো অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের সন্ধানে নদীতীরে ভিড় করছেন স্বজনরা। 

কেউ কেউ ট্রলার নিয়ে নদীতে খুঁজে বেড়াচ্ছেন প্রিয়জনকে। কারো হাতে নিখোঁজদের ছবি, তা নিয়ে নদী তীরের বাসিন্দাদের দেখাচ্ছেন আর বিলাপ করছেন।

লঞ্চের কতজন যাত্রী নিখোঁজ আছেন, সে তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। তবুও শনিবার সকালে নিজের মেয়ে, নাতি-নাতনি, মেয়ে জামাইকে খুঁজতে আসেন ৭০ বছরের বৃদ্ধা ফরিদা বেগম।

স্বজনদের কাউকে খুঁজে না পেলেও, খুঁজে পেয়েছেন প্রিয় নাতনির আধা পোড়া কাপড়। আর সেই কাপড় ধরেই তার বিলাপে শোকের ঢেউ তোলে সুগন্ধার তীরে।

তার মতন আব্দুর রহিমও এসেছেন বোন আর ভাগ্নেকে খুঁজতে। কিন্তু তার ভাগ্যে পোড়া টুকরো কাপড়টিও জোটেনি।

ফরিদা বেগম, রহিমের মতো প্রিয়জনকে খুঁজে পাবার আশায় ট্রলার নিয়ে লাশের খোঁজে বেড়িয়ে পরেছেন এ রকম ৩৬টি পরিবার। নদী জুড়ে খুঁজে ফিরছেন আপনজনকে, জীবিত কি মৃত। 

নিখোঁজদের ছবি নদী তীরের বাসিন্দাদের দেখাচ্ছেন আর বিলাপ করছেন। নিখোঁজদের সম্পর্কে কোন ধারনাই দিতে পারছেন না দুর্ঘটনাস্থলের তীরের মানুষরা।

কেউ নদী তীরের মিনিপার্ক, ডিসিপার্ক, লঞ্চঘাট ও ঘটনাস্থল দিয়াকুল এলাকায় ঘুরছেন। অন্তত নিখোঁজ স্বজনদের মরদেহ যেন বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন, সেই অপেক্ষায় আছেন স্বজনরা।

অন্যদিকে, নিখোঁজদের খোঁজে লঞ্চঘাট এলাকায় শনিবার সকাল থেকে আবারও উদ্ধার কার্যক্রম চালায় ঝালকাঠি ও বরিশাল জেলার ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, লঞ্চে আগুন লাগার পর অনেকে জীবন বাঁচাতে নদীতে লাফ দেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বেঁচে ফিরলেও নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। 

বেঁচে ফেরা যাত্রীরা জানান, রাতে যখন আগুন লাগে তখন লঞ্চটিতে বেশিরভাগ যাত্রী ঘুমিয়ে। হঠাৎ আগুনের তাপে ঘুম ভেঙ্গে পড়িমড়ি করে উঠে দিগভ্রান্ত ছোটাছুটি শুরু করে যাত্রীরা।

প্রাণ বাঁচাতে কিছু না ভেবেই তাঁদের অনেকে মাঝনদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রিয়জন, সহযাত্রীদের না পেয়ে আর্তচিৎকার করতে থাকেন অনেকে।

ঘুম থেকে উঠে ভয়ংকর এক বিভীষিকায় দিশাহারা সব যাত্রী। সুগন্ধা নদীর বুকে রাতের আকাশ লাল করে জ্বলে উঠতে থাকে লঞ্চটি।

সুগন্ধা নদীর মাঝখানে অভিযান-১০ নামের তিনতলা লঞ্চটি এভাবেই ঘণ্টাখানেক চলে একটা সময় পর পারে গিয়ে থামে। কিন্তু ততক্ষণে ঝরে গেছে বহু প্রাণ। 

আগুনের কারণ জানতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি। জানালেন, অভিযান-১০ লঞ্চে কি কারণে আগুন লেগেছিলো, তা জানতে কিছুটা সময় লাগবে। 

সেই সঙ্গে তারা জানালেন, তদন্ত শেষে আগুন লাগার পেছনে দোষীদের শনাক্ত করা যাবে এবং তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। 

২৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাত তিনটার দিকে ঢাকা থেকে বরগুনার উদ্দেশে যাওয়া অভিযান-১০ লঞ্চে আগুন লাগে। এতে এখন পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত ৭০ জনের বেশি। 

তাদেরকে ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।

বলা যেতে পারে, এটিই দেশে প্রথম ঘটনা যেখানে চলন্ত লঞ্চে আগুনে এতো মানুষের প্রাণহানি ঘটলো। লঞ্চ ডুবির ঘটনা শোনা গেলেও, আগুন দুর্ঘটনার খবর স্মরণে নেই কারো।

লঞ্চটিতে ৪০০ যাত্রী থাকার কথা কর্তৃপক্ষ বললেও প্রাণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা বলছেন, গাদাগাদি করে আট শতাধিক যাত্রী নেয়া হয়েছিলো। 

আগুন লাগার পর লঞ্চটিকে দ্রুত তীরে ভেড়ানোসহ যাত্রীদের রক্ষায় কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলেও অভিযোগ করছেন যাত্রীরা।



একাত্তর/এসএ