নওগাঁয় মাঘ মাসের শেষ সপ্তাহের বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। তলিয়ে গেছে নিচু এলাকার বোরো ধান। ক্ষতির মুখে পড়েছে আলু, পেঁয়াজ, সরিষাসহ রবিশস্যের ক্ষেত।
শনিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) উপজেলার বিভিন্ন এলাকার রবিশস্যের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে কপি, আলু, পেঁয়াজ, সরিষাসহ নানা ধরণের সবজির ক্ষেতে পানি থইথই করছে। চড়া দামে সার ও বীজ কিনে কৃষকরা চাষবাদ করেছেন। কিন্তু শীতকালের হঠাৎ বৃষ্টি তাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
বদলগাছী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাগরে লঘুচাপের কারণে বৃহস্পতিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ২টা থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়। শুক্রবার দিনভর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হয়েছে। শনিবার দুপুরে শিলাবৃষ্টিও হয়েছে এ জেলায়।
কৃষকের বলছেন, হঠাৎ বৃষ্টিতে নিচু এলাকার সদ্য রোপনকৃত বোরো ধানের চারা তলিয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে অনেক বীজতলা। দু'একদিনের মধ্যে পানি সরে না গেলে জমির চারা পচে নষ্ট হয়ে যাবে। নতুন করে ওইসব জমিতে আবারো চারা রোপন করতে হবে। এতে চারার সংকট দেখা দিবে। চারা না পেলে নষ্ট হওয়া জমিতে দ্বিতীয়বার ধান রোপন করা সম্ভব হবে না। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ২৩ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আলুর আবাদ হয়েছে এক হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে। কিন্তু হটাৎ করে মাঘের এই বৃষ্টিতে ফলন বির্পযয়ের আশংকা করছেন আলু চাষিরা। জেলার চলতি বোরো মৌসুমে এক লাখ ৮৫ হাজার আটশ' হেক্টর জমিতে ধান চাষ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার চকআতিতা গ্রামের আলু চাষি রহমান ইসলাম জানান, সাড়ে তিন বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছি। চলতি মাসের শেষের দিকে ক্ষেত থেকে আলুগুলো উঠাবো। কিন্তু থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। চেষ্টা করছি ক্ষেত থেকে বৃষ্টির পানি সরাতে কিন্তু বৃষ্টি তো একবারে থামছেই না। যদি আরও তিন থেকে চারদিন ধরে বৃষ্টি হয় তবে, ক্ষেতে পানি আরও জমে যাবে আলুর ক্ষেতে পচন ধরতে পারে। ফলন কমে যেতে পারে। এমন অবস্থায় খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
মান্দা উপজেলার পশ্চিম নুরুল্লাবাদ গ্রামের কৃষক মনসুর রহমান বলেন, বৃষ্টিতে তার ৪০ কেজির ধানের বীজতলা তলিয়ে গেছে। পানি সরে না গেলে বীজতলার চারা নষ্ট হয়ে যাবে। এতে চারার সংকট দেখা সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে তার রোপনকৃত দুই বিঘা জমির ধানও তুলিয়ে গেছে পানিতে।
চলতি মৌসুমে তিনি ১৫ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছেন উপজেলার নলতৈড় গ্রামের কৃষক আবুল কালাম। তিনি বলেন, হঠাৎ বৃষ্টিতে তার পেঁয়াজের জমিগুলোতে পানি আটকে গেছে। পানি সরে না গেলে পেঁয়াজের চারা পচে নষ্ট হবে। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন তিনি।
বদলগাছী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদুর রহমান বলেন, সাগরে লঘুচাপের কারণে বৃহস্পতিবার রাত ২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত একটানা বৃষ্টি হয়। এছাড়া শুক্রবার সারাদিনই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা/ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হয়েছে। রোববার (৬ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ২টা থেকে শনিবার পর্যন্ত জেলায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় প্রায় ৫০ মিলিমিটার।
আরও পড়ুন: করোনা: বিশ্বে কমেছে মৃত্যু ও শনাক্ত
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শামছুল ওয়াদুদ বলেন, শুক্রবারের চেয়ে শনিবারে কম বৃষ্টি হয়েছে। সেহেতু রবিশস্যের খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা না। ধান-গম ও ভুট্টার জন্য আর্শীবাদ হয়েছে এই বৃষ্টি। তবে যদি একটানা তিন-চারদিন বৃষ্টি হয় তাহলে আলু ক্ষেতের ক্ষতি হতে পারে। ফলন বির্পযয় হতে পারে। কারণ টানা বৃষ্টিতে ক্ষেতে ইতিমধ্যে আলুর ক্ষেতে পানি জমে গেছে।
অনেক আলু চাষি ক্ষেত পানি সরানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু আরও বৃষ্টি হলে ক্ষেতে আরও পানি জমে যাবে। যার কারণে আলুর খেতে পচন ধরতে পারে। তাহলে আশানুরুপ ফলনের বিপর্যয় হতে পারে। চাষিরাও এতে করে লোকশানের মুখে পড়তে পাড়বেন। এমন অবস্থায় আলুগুলো তুলেও কোনো লাভ হবে না। তুলে রেখে দিলেও সেগুলো পচে যেতে পারে। বৃষ্টি কমার পর অবস্থা অনুযায়ী ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া নাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি অফিস থেকে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
একাত্তর/আরবিএস