রেলমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয়ে বিনা টিকেটে রেল ভ্রমণ এবং ওই যাত্রীদের জরিমানাসহ টিকেট করায় বরখাস্ত হয়েছিলেন ট্রেনের ভ্রাম্যমাণ টিকেট পরীক্ষক (টিটিই) মো. শফিকুল ইসলাম।
শুক্রবার (৬ মে) সেই বরখাস্তের আদেশ রোববার (৮ মে) প্রত্যাহার করে স্বপদে বহাল রেখে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাকে।
সেদিনের সেই অভিজ্ঞতার কথা একাত্তরকে জানিয়েছেন টিটিই শফিকুল।
তিনি জানান, এক নম্বর প্লাটফর্মে গাড়ি আসার পরে আমাকে জানানো হয় এসিও (সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মো. নুরুল আলম) স্যারের অনুরোধে তিনজন যাত্রী উঠেছেন। তারা এসি কেবিন যেটা ফাঁকা আছে সেখানে উঠেছেন।
তখন আমি বলি, তাহলে কি এসিও স্যারকে ফোন করে জেনে নেবো তারা কিভাবে যাবেন। যেহেতু তারা বলেছে বিনা টিকেটের যাত্রী।
তখন এসিও স্যারকে ফোন দিয়েছিলাম। তখন স্যার আমাকে বলেন, রেলমন্ত্রী মহোদয়ের আত্মীয় তিনজন আছে, ওরা এসি রুমের কেবিনে যাবে।
আমি তখন বলেছি, স্যার আসলে তাদের তো কোনো টিকেট নাই। তাহলে কী করবো। তখন স্যার বলেন, তাহলে তাদের সাধারণ মানের যে টিকেট আছে ওটা করে দিয়েন। তারপর যাত্রীদের সঙ্গে আমার কোনো সাক্ষাৎ বা কোনো কিছুই হয়নি। তারা বিনা ভাড়ায় যাবেন কী না ট্রেনের গার্ডরাও এ বিষয়ে আমাকে কিছু জানায় নাই। হয়তো স্যারের সঙ্গে তাদের (গার্ড) কথা হতে পারে, কিন্তু আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তারপর যথারীতি গাড়ি (ট্রেন) চালু হলে আমি চেকিং শুরু করি।
তিনি বলেন, ট্রেনে চেকিং শুরু করার সময় ট্রেনের অপারেটরকে জিজ্ঞেস করি কোনো কেবিনে তারা (মন্ত্রীর আত্মীয়) আছেন?
আমাকে দেখানোর পর আমি সেখানে যাই। আমি তাদের (যাত্রীদের) সম্মানের সঙ্গে বলি, আপনাদের তো মনে হয় কোনো টিকেট নেই। আমাকে এসিও স্যার যেহেতু বলেছেন, তাই নরমাল যে ভাড়া সেটা দিন, আমি টিকেটে করে দেই।
তখন ওই যাত্রীরা বলেন, কত টাকা ভাড়া। আমি বলি, তিনজনের জনপ্রতি ৩৫০ টাকা হারে এক হাজার ৫০ টাকা। টাকা নিয়ে আমি তাদের ভাড়া আদায়ের রশিদ দিয়ে চলে গেছি। এছাড়া তাদের সঙ্গে আমার আর কোনো কথা হয়নি। তবে কি কারণে, কিসের জন্য আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছিলো সেটি আমি বুঝতেই পারি নাই।
মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় পাওয়ার পরও তাদের জরিমানা করেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ, বাড়তি ভাড়ার টিকেট ছাড়া আমি যেহেতু টিকেট ইস্যু করতে পারি না, তাই তাদের জরিমানাসহ টিকেট দিয়েছি। ঈশ্বরদীর থেকে ঢাকার কাউন্টার ভাড়া ২৯৫ টাকা, জরিমানাসহ জনপ্রতি ৩৫০ টাকা করে এক হাজার ৫০ টাকা নিয়েছি।
তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল বলেন, আমি ওপর ওয়ালারকে (আল্লাহ) সাক্ষী রেখে বলছি আমার সঙ্গে তাদের এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। তারা কি কারণে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলো আমি সেটা জানি না, বলতেও পারবো না।
এদিন সকাল ১০টা থেকে পাকশীর বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার (ডিসিও) কার্যালয়ে তদন্ত কমিটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সেটি শুরু হতে বেলা ১২টা বেজে যায়। এর মধ্যে তদন্ত কমিটির সকল সদস্য হাজির হন।
এরপরেই বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে স্বপদে বহলা করেন পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক শাহিদুল ইসলাম।
আরও পড়ুন: বেজায় চটেছেন রেলমন্ত্রীর শ্বশুরকূল
খবরটি শোনার পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, আমি খুব খুশি হয়েছি, আমাকে কাজের সুযোগ দিয়েছেন। আমি কোনো অন্যায় করিনি। আশা করছি ঘটনার সঠিক তদন্তে ন্যায় বিচার পাবো। এছাড়া আমার কিছু বলার নেই।
এর আগে শনিবার (৭ মে) ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এতে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে সহকারী পরিবহণ কর্মকর্তা (এটিও) সাজেদুল ইসলামকে প্রধান এবং সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএন) শিপন আলী ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সহকারী কমান্ডেন্ট (এসিআরএনবি) আবু হেনা মোস্তফা কামালকে সদস্য করা হয়েছে। তদন্তের মেয়াদ দুই থেকে বাড়িয়ে চারদিন করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সেদিনের ওই কেবিনে রেল সংশ্লিষ্ট ও যাত্রী কারা ছিলো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক ঘটনার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন করেন এই কর্মকর্তা।
একাত্তর/এসি