ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কুড়িগ্রামে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে দুই লক্ষাধিক মানুষ। উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় জেলার ৯টি উপজেলার দুই শতাধিক চর ও নদী সংলগ্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। । প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
পানি বাড়ার সাথে সাথে তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। সেই সাথে বানভাসী এলাকায় দেখা দিয়েছে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, গো-খাদ্যে ও জ্বালানির তীব্র সংকট।
গত তিনদিনে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার ৯ উপজেলার ৩০টি ইউনিয়নের প্রায় ১৫০টি গ্রামের প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পরেছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৬০টি বাড়ি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে শনিবার সকাল ৬টায় সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ২২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমার ৭ ও কাউনিয়ায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে রৌমারী, উলিপুর ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বানভাসী মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বন্যায় জেলায় প্রায় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ফসলাদি নিমজ্জিত হয়েছে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার ৩০টি পয়েন্টে নদী ভাঙন তীব্র রুপ নিয়েছে। বিলীন হচ্ছে বাস্তভিটা ও আবাদী জমি। ভাঙনে বিলীনের ঝুঁকিতে রয়েছে ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
নদীভাঙন ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পরায় বানভাসী মানুষ রয়েছে চরম দুর্ভোগের মধ্যে। এদিকে তীব্র পানির রাতে নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মুড়িয়ারহাট এলাকায় অস্থায়ী বেরিবাঁধের ২০/২২ ফুট ভেঙ্গে মেইনল্যান্ডের ফসলাদি তলিয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে উপাজেলা প্রশাসন থেকে রৌমারীতে ৬হাজার এবং সদর উপজেলায় প্রায় ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।
যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, তার ইউনিয়নে এক হাজার দুইশত বাড়ি পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় প্রায় ৬হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া তিন হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। গত ৫দিনে নদী ভাঙ্গন এবং পানির তোড়ে আরাজিপাড়া, রলাকাটা ও চর যাত্রাপুরের ৬০ পরিবার বাড়িঘর হারিয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম দুপুরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ যাত্রপুর ইউনিয়নের পোড়ারচর, রলাকাটা এলাকার বন্যাদুর্গত মানুষের খোজখবর নেন এবং ত্রাণ বিতরণ করেন।
এদিকে কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুর রশীদ জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফা বন্যায় তলিয়ে যাওয়া ফসলের ক্ষতির সম্ভাবনা বেড়েছে। পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতি নিরুপন শেষে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নজরে নেয়া হবে। যাতে বন্যা পূনর্বাসন প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় তাদেরকে সহযোগিতা করা যায়।
কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিসার শামছুল আলম জানান, জেলায় মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা পর্যায়ে ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্যার কারণে বন্ধ রয়েছে আর একটি প্রতিষ্ঠান আশ্রয় কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শহিদুল ইসলাম জানান, বন্যার পানি অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় রৌমারীতে ৪৪টি এবং কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ১১টি সহ ৫৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মনজুর এ মুর্শেদ জানান, বন্যায় জেলার ৫টি উপজেলা রৌমারী, রাজিবপুর, চিলমারী, উলিপুর ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ৮০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। বন্যাদুর্গতদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে ৮৫টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, বন্যায় মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনায় ৯উপজেলার বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তার জন্য ২৯৫ মেট্রিকটন চাল, নগদ ১৪ লাখ ৫০হাজার টাকা, শুকনা খাবার এক হাজার প্যাকেট, শিশু খাদ্য ক্রয় বাবদ ১৮লাখ ৯৫হাজার টাকা এবং গো-খাদ্য ক্রয় বাবদ ১৭ লাখ ৭৫হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা প্রস্তুত করে বিতরণ করবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তিনি আরো জানান,বর্তমানে মজুদ আছে ৮ লক্ষ টাকা এবং ৩০৮ মেট্রিকটন চাল । আর নতুন করে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে পাঁচশত মেট্রিকটন চাল, ১০লাখ টাকা এবং ১০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার।
একাত্তর/এসএ