এক অচিন পাখি নিয়ে নেত্রকোণায় দিনভর অভিযান

ছোট্ট একটি লোহার খাঁচায় অচেনা এক পাখি। খাঁচা নিয়ে বাজারে ঘুরছেন বিক্রেতা। দাম হাঁকছেন তিন হাজার পাঁচশ টাকা। এমন দামে কোনো ক্রেতাকে কাছে ভিড়তে দেখা না গেলেও পরে এক হাজার পাঁচশ টাকায় বিক্রি হয়ে যায় অচিন পাখিটি। 

পাখিটি দেখতে ধবধবে সাদা, বড়ো দুটি ডানা হালকা কালো। বড়ো আকৃতির মাথায় কালো রঙ, আর লম্বা ঠোঁটে হলুদ-লালের মিশ্রণ। এমন পাখি দেখে কৌতূহলের মাত্রাও দ্বিগুণ বেড়ে যায় স্থানীয়দের। 

পাখিটির নাম কী জানতে চাওয়া কাউকেই এর উত্তর দিতে পারেন নাই বিক্রেতা। কেননা তিনি নিজেও জানেন না। অনেকটা হাঁসের মতো দেখায় অনেকেই বলছেন বালিহাঁস, পাতিহাঁসসহ বিদেশি অতিথি পাখির নামে। 


এদিকে বিক্রির জন্য পাখি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর খবর কানে যায় পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যদের। বিক্রেতার খোঁজে এবার বাজারে এই অলিগলিতে ছুটছেন স্বেচ্ছাসেবকরা। তাদের উপস্থিতি টের পেয়েই পাখি বিক্রেতাও কৌশল পাল্টে পাখি নিয়ে পালিয়ে যান বাড়িতে। ততক্ষণে বিষয়টি কানে পৌঁছেছে স্থানীয় প্রশাসনের। শুরু হয়েছে পাখি উদ্ধারে প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের যৌথ অভিযান। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, অবশেষে সন্ধান মেলে অচেনা পাখির। 

অচিন এই পাখির সন্ধানে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে এভাবেই দিনভর অভিযান চালিয়েছেন প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকরা। বৃহস্পতিবার বিকেলে পৌর শহরের শিবগঞ্জ এলাকার একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় এই পাখিটি। বড়ো আকৃতির এই পাখি মূলত কালো মাথা গাংচিল। পাহাড়ি এলাকায় এর আগে তেমন একটা দেখা মেলেনি, তাই সবার কাছেই এটি অচেনা। 


স্থানীয়রা জানান, গত কয়েকদিন ধরে টানা বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বেড়েছে সোমেশ্বরী নদীর পানি। গত বুধবার (১১ আগস্ট) রাতে নদীর ঘরের পানিতে ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে পাখিটিকে পানিতে ভেসে আসতে দেখে এক ব্যক্তি। রাতেই তীব্র স্রোত কাটিয়ে পাখিটি উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে যান। পরে সকালে স্থানীয় এক বাসিন্দাকে নিয়ে পাখিটিকে দুর্গাপুরে বাজারে বিক্রি করতে আসেন। 

শহরের তেরি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে পাখিটিকে ঘোরাঘুরি এক পর্যায়ে স্থানীয় পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সদস্যদের জেরার মুখে তাৎক্ষণিক পাখি নিয়ে পালিয়ে যান তারা। স্বেচ্ছাসেবকরা স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি অবগত করলে পাখি উদ্ধারে শুরু করেন অভিযান।

এদিকে পাখিটিকে নিয়ে সোমেশ্বরী নদী পার হওয়ার সময় পৌর শহরের ৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রাশিদ মোড়লের কাছে এক হাজার পাঁচশ টাকায় বিক্রি করে গা ঢাকা দেন পাখি বিক্রেতা। পাখিটিকে খোঁজ করার খবর স্থানীয় কাউন্সিলর জানতে পেরে উপজেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের ফোন করে পাখিটি তার হেফাজতে রয়েছে বলে জানান। বিকেলে প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকরা পাখিটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। 

প্রাণিবিদরা বলছেন, এটি মূলত সামুদ্রিক পাখি। এটিকে কালো মাথা গাংচিল বলা হয়।  কক্সবাজার ও টেকনাফে এদের সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে। দেশের বিভিন্ন বড়ো নদী ও জলাশয় মাঝেমধ্যে এদের দেখা মেলে। সমুদ্রে নির্জন উপকূলে থাকা এই পাখি উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা মেলায় অনেকটা অবাক ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে। দেশে এ পাখি অনেক দেখা গেলেও এটি দেশীয় কোনো পাখি নয়, এদের পরিযায়ী পাখি বলে। যার অর্থ দাঁড়ায় এরা দেশের অতিথি পাখি। এই পাখিটি সাধারণত ইউরোপ, এশিয়া এমনকি কোস্টাল ইস্টার্ন কানাডায় সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়। তবে নর্থ আমেরিকাতেও এদের বিস্তার রয়েছে। 

স্থানীয় কাউন্সিলর রাশিদ মোড়ল একাত্তরকে জানান, আজ দুপুরের পর হাসপাতাল থেকে পায়ের ড্রেসিং করে বাড়ি ফেরার পথে সোমেশ্বরী নদীর ঘাটে এক ব্যক্তির হাতে পাখিটিকে দেখতে পাই। প্রথম দিকে এটি বালিহাঁস ভেবে বিক্রেতাকে দাম জিজ্ঞাসা করি। শুরুর দিকে বিক্রেতা প্রায় তিন হাজার টাকার ওপরে এর দাম চাইলেও অনেক দরদাম করে পনেরো’শ টাকায় পাখিটিকে কিনে বাড়িতে নিয়ে আসি। বাড়িতে আসার পর জানতে পারি এই পাখির খোঁজ করছেন উপজেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকরা। পরে আমি নিজেই তাদের ফোন করে পাখিটি আমার হেফাজতে আসেন বলে জানালে বিকেলে বাড়ি থেকে এসে তারা নিয়ে যান।

 

সেভ দ্য এনিমেলস অফ সুসং সংগঠনের সদস্য মুহতাসিম আলম মারুফ একাত্তরকে জানান, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসার, দুর্গাপুর থানা ওসির সাথে যোগাযোগ করলে পাখি উদ্ধারের জন্য তারা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বিকেলে আমরা স্থানীয় কাউন্সিলের বাড়ি থেকে সামগ্রিক এই পাখিটি উদ্ধার করে নিয়ে আসি। পাখিটির অবস্থা খুবই খারাপ। বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং পাখিটি দাঁড়াতে পারছে না। আমরা একটি প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি এবং সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এর সেবা-যত্ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এটি সুস্থ হলে আমরা পাখিটিকে যথাযথ স্থানে অবমুক্ত করে আসবো। 

উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজিব উল আহসান একাত্তরকে জানান, এর আগে এলাকায় এই পাখি তেমন একটা দেখা মেলেনি। যেহেতু এই পাখিটি এখন উদ্ধার হয়েছে আমরাও এ ব্যাপারে আরও খোঁজখবর নিচ্ছি। কেউ যেন পাখিসহ কোনো বন্যপ্রাণী না ধরে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে।