জেলেদের সচেতন করে ডলফিন রক্ষার আহ্বান বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে একের পর এক ডলফিন মারা যাওয়ায় উদ্বিগ্ন মৎস্য বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা। এই বর্ষা মৌসুমেই কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে এসেছে ছয়টি ডলফিনের মৃতদেহ। যা সাগরে ফেলে রাখা জালে আটকে ও পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সমুদ্রে ডলফিনগুলো নির্বিঘ্নে চলাচল করলেও অবরোধ শেষে জেলেরা গভীর সমুদ্রে জাল ফেলার সঙ্গে সঙ্গে ডলফিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। যেগুলোর মৃতদেহ কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন সাগর মোহনায় ভেসে আসছে।

সমুদ্র তটের বালু ক্ষয়ে সাগরে পানির উচ্চতা বাড়ায় ডলফিনের বিচরণ ক্ষেত্রে জাল ফেললেই সেগুলো জালে আটকা পড়ছে বলে মৎস্য গবেষকরা মনে করছেন। আর পরিবেশবিদরা বলছেন, ডলফিনের মৃত্যু ঠেকাতে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

টানা লকডাউন শেষে আগামী ১৯ আগস্ট থেকে খুলছে পর্যটন কেন্দ্র। দীর্ঘসময় কুয়াকাটা সৈকতে পর্যটকদের বিচরণ না থাকায় নতুন রূপ ধারণ করেছে সৈকত। সাগরের ভাঙনে মূল সৈকত ভাঙলেও প্রকৃতি জেগে উঠেছে আপন মহিমায়। সৈকতে নতুন জীব ও প্রাণী বৈচিত্র্যের নবজাগরণ গোটা সৈকতই যেন অপরূপ সৌন্দর্যের শোভা ছড়াচ্ছে।

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে প্রকৃতি তার সৌন্দর্য মেলে ধরলেও সাগরে হঠাৎ ডলফিন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এ সপ্তাহে সৈকতে ভেসে এসেছে তিনটি ডলফিনের মৃতদেহ। আর কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির হিসাব মতে, প্রতিবছর সৈকতে অন্তত ১২টি ডলফিনের মৃতদেহ ভেসে আসে। যা ভাবিয়ে তুলছে পরিবেশবিদদের।

সাগরে মাছ শিকার করা জেলেরা হাজালী বড়শি ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার ক্রমশ বাড়িয়ে দেওয়ায় অতি লোভে সমুদ্র ছেকে নিয়ে আসছে। এতে সমুদ্রের ছোট মাছ থেকে শুরু করে সব ধরনের জলজ প্রাণি আটকা পড়ছে। জেলেরা শুধু যে মাছগুলো বিক্রি হয় সেগুলো রেখে অন্য মাছগুলো ফেলে দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ডলফিন, হাঙ্গর, কচ্ছপসহ তিমি মাছও।

কলাপাড়ায় ডলফিন রক্ষা কমিটির সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, কুয়াকাটায় গভীর সমুদ্রে ডলফিন মারা বন্ধে সেচ্ছাসেবী সংগঠন কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির কাজ করলেও গভীর সমুদ্রগামী জেলেরা সচেতন না হওয়ায় প্রায়ই সৈকতে ভেসে আসছে ডলফিনের মৃতদেহ। যা ভাবিয়ে তুলছে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোকে। তাই ডলফিন হত্যা বন্ধে জেলেদের সচেতন করার দাবি করছে ডলফিন রক্ষা কমিটি।

এদিকে কুয়াকাটায় মাছ ধরারত জেলেরা ডলফিন হত্যার কথা অস্বীকার করলেও সাগরে বিভিন্নসময়ে জালে ডলফিন, তিমি ও হাঙ্গরসহ বিভিন্ন বিলুপ্ত প্রজাতির জলজ প্রাণী আটকা পড়ার কথা স্বীকার করেন। তবে সেগুলো সাগরে ছেড়ে দেয় বলে জানান তারা। 

মৎস্য গবেষকরা বলছেন, তিমি ও ডলফিন সমুদ্রের স্তন্যপায়ী প্রাণী। পৃথিবীতে ৪০টি প্রজাতির ডলফিন রয়েছে। ১.২ মিটার (৪ ফুট) দৈর্ঘ্য এবং ৪০ কেজি ওজন (মাউয়ের ডলফিন) থেকে শুরু করে ৯.৫ মিটার (৩০ ফুট) দৈর্ঘ্য এবং ১০ টন ওজনের পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের ডলফিন দেখা যায়।

বাংলাদেশ ফিসারিজ রিসার্স ইন্সটিটিউটের খেপুপাড়া কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিক খান বলেন, ডলফিন মাংসাশী প্রাণি। মাছ এবং  সমুদ্রের স্কুইড এদের প্রধান খাদ্য। কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে আসা মৃত ডলফিনগুলো হ্যাম্পব্যাক, বটলনোজ ডলফিন ও ইরাবতী প্রজাতির। এসব ডলফিনের চোয়াল বেশ লম্বা হয় এবং ৩০ থেকে ৩৪টি দাঁত থাকে।

ডলফিন ম্যামাল গোত্রীয় প্রাণী। অর্থাৎ মাতৃদুগ্ধ পান করে। এসব প্রাণীকে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরপর অক্সিজেন নিতে পানির ওপরের দিকে উঠতে হয়। অক্সিজেন নিতে গিয়ে মাছ ধরার জন্য সমুদ্রে ফেলা জালের সঙ্গে পেঁচিয়ে, মাছ ধরার ট্রলার অথবা জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তারা মারা যায়।

কুয়াকাটায় প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, সাগরে নিষিদ্ধ জাল ও হাজারী বড়শির ব্যবহারে শুধু ডলফিন না মারা পড়ছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কচ্ছপ।

এর আগে কুয়াকাটা সৈকতে একাধিক মৃত কচ্ছপের মৃতদেহ ভেসে আসে। ভেসে আসে মৃত তিমি মাছ। কিন্তু এখন যে পরিমাণে ডলফিন মারা পড়ছে তাতে সমুদ্র মৎস্য সম্পদে বিরূপ প্রভাব পড়বে। জেলেদের সচেতন করা না হলে এর ভয়াবহতা ক্রমশ বাড়বে।

আরও পড়ুন: এক অচিন পাখি নিয়ে নেত্রকোণায় দিনভর অভিযান

আর কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, ডলফিন মৃত্যুর ঘটনাটি জেলা পর্যায়ে জানানো হয়েছে। সমুদ্রের এই বন্ধু প্রাণীটিকে রক্ষায় জেলেদের সচেতন করতে খুব শীঘ্রই উদ্যোগ নেয়া হবে।

পটুয়াখালীর ওয়ার্ল্ড ফিসের সহকারী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি বলেন, কুয়াকাটায় প্রতিবছর ডলফিন, কচ্ছপ ও তিমিসহ বিভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় জলজ প্রাণীর মৃতদেহ ভেসে এলেও এগুলোর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে কখনোই গঠিত হয়না কোন তদন্ত কমিটি। করা হয় না মৃত প্রাণীর ময়নাতদন্ত। এ কারণে মৃত-প্রাণী ভেসে আসলে সেগুলো মাটি চাপা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে দায়িত্বরতরা। যা অনুচিত। এবং সকলের এ বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত।


একাত্তর/আরএ