নিখোঁজের নাটক সাজিয়ে দুই সন্তানকে হত্যা, লাশ ফেলেন হাওরে

পারিবারিক অশান্তি ও স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় দুই শিশুসন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বাবা। সন্তানদের নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হওয়ার নাটকও সাজান তিনি। দুইদিন আত্মগোপনে থাকার পর শিশু সন্তানদের ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে আলাদা দুটি হাওরে ফেলে হত্যা করেন। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মধুপুর পেরুয়া গ্রামের দুই শিশুকে হত্যার দায়ে আটক পাষণ্ড বাবা কামরুজ্জামান কামরুলের এমন লোমহর্ষক ঘটনায় বাকরুদ্ধ এলাকাবাসী।

জানা যায়, ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে সুনামগঞ্জের ছাতক ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার মধ্যবর্তী হাওর থেকে ভাসমান অবস্থায় একটি মেয়ে শিশুর মরদেহ এবং সদর উপজেলার গোবিন্দপুরের দেখার হাওর থেকে একটি ছেলে শিশুর অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরপর দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে তদন্তে নামে পুলিশ।

এদিকে, গত ৭ আগস্ট জেলার দিরাই উপজেলার মধুপুর পেরুয়া গ্রামে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে নিখোঁজ হন কামরুল। পরে নিখোঁজ দুই সন্তানকে হত্যার সন্দেহে বাবা কামরুল ইসলামকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে ঘটনার মূল রহস্য। নিজ সন্তানদের হত্যা করে বড়কাপন ও গোবিন্দপুর এলাকার হাওরে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন কামরুল।

পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, আটক কামরুল একজন ক্ষুদ্র ফেরিওয়ালা। চার সন্তান, বিধবা মা ও স্ত্রীসহ সাতজনের টানাপড়েনের সংসার তার। কয়েক দিন আগে মায়ের সঙ্গে ঝগড়াকে কেন্দ্র করে স্ত্রী আফরোজা বেগমের সঙ্গে কামরুলের বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরিবারে অশান্তি ও স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় গত ৭ আগস্ট দুই শিশু সন্তান মুহাদ্দিস (৭) ও তুলনাকে (৫) নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে সিলেটে যান কামরুল।

যাওয়ার পথে বড়কাপন এলাকায় পাঁচ বছরের মেয়ে তুলনাকে হাওরের পানিতে ফেলে হত্যা করেন তিনি। এরপর দুই দিন সিলেট শহরে অবস্থান করেন কামরুল। রবিবার ছেলে মুহাদ্দিসকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে সদর উপজেলার গোবিন্দপুর এলাকার হাওরে ফেলে হত্যা নিশ্চিত করেন তিনি।

রাতে বাড়িতে ফিরে পরিবারের পক্ষ থেকে সন্তানদের বিষয়ে জানতে চাইলে তাদের নিখোঁজ হওয়ার নাটক সাজান কামরুল। পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে খবর পেয়ে বুধবার সকালে মধুপুর গ্রামে যায় পুলিশ। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সন্তানদের হত্যার কথা স্বীকার করেন কামরুল।

দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ আমিনুল ইসলাম বলেন, উপজেলার মধুপুর গ্রামে পিতাসহ দুই সন্তান নিখোঁজ থাকার খবর পায় পুলিশ। পরিবার ও স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেন। রবিবার রাতে কামরুল একা বাড়িতে ফিরলে তার কাছে সন্তানদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান। স্বজনদের সন্দেহ হলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সন্তানদের হত্যা করেছেন বলে স্বীকারোক্তি দেন তিনি।

ওসি বলেন, সদর ও ছাতকের দুটি স্থান থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ। আটক কামরুলের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মরদেহ উদ্ধারের স্থানসহ অন্যান্য তথ্যের মিল পাওয়া গেছে। শিশুদের মা নিজেই মরদেহ দুটি শনাক্ত করেছেন। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘাতকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

পিতার হাতে সন্তানদের এমন নির্মম পরিণতিতে বাকরুদ্ধ মধুপুর গ্রামের মানুষ। এমন ঘটনার সাক্ষী তারা আগে কখনো হননি। পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে ভয় ও আতঙ্ক। গ্রামের শিশুদের চোখে-মুখেও দেখা গেছে অজানা বিস্ময়। আপন বাবার হাতে নিজ সন্তান হত্যার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘাতক পিতার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল জলিল বলেন, এ ধরনের ঘটনা তাদের এলাকায় আগে কখনো ঘটেনি। তারা এমন ঘটনা বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ ঘটনায় তারা আতঙ্কিত। ঘাতক কামরুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় মা আফরোজা বেগম। সন্তান হত্যার দায়ে ঘাতক স্বামীর বিচার দাবি করেছেন তিনি। আফরোজা বেগম বলেন, তিনি তার সন্তানদের হত্যার বিচার চান। স্বামী নামের আসামির ফাঁসি চান তিনি।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, বাবার হাতে নিষ্পাপ শিশু হত্যা সমাজের অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে। জড়িত ব্যক্তির কঠোর বিচারের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক অনুশাসন আরও সুদৃঢ় করার দাবি জানিয়েছেন তারা।