মাছের রাজ্যেই মাছের আকাল, দুশ্চিন্তায় জেলে-ব্যবসায়ীরা

লক্ষ্মীপুর উপকূলের জেলেদের জালে উঠছে না আশানুরূপ ইলিশ। ভরা মৌসুমেও নদী-সাগরে জাল ফেলে আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না তারা। এতে জ্বালানি, বরফ, খাবার ও শ্রমিকের খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে জেলেদের। দিনের পর দিন নদী ও সাগরে অবস্থান করেও ফিরতে হচ্ছে সামান্য মাছ নিয়ে। অন্যদিকে সরবরাহ কম থাকায় বাজারে বেড়েছে ইলিশের দাম। সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তায় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা।

জেলে ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগর ঘিরে লক্ষ্মীপুরে গড়ে উঠেছে বিশাল মৎস্য অর্থনীতি। নদী-সাগরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজারো জেলে। বর্ষা মৌসুমে মেঘনায় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে ওঠে উপকূলের মাছঘাট, আড়ত ও বাজার। কিন্তু এবার সেই চেনা দৃশ্য অনেকটাই উধাও।

জেলেরা জানান, দিন-রাত নদী ও সাগরে অবস্থান করেও অনেককে ফিরতে হচ্ছে সামান্য মাছ নিয়ে। অথচ মাছ ধরতে প্রতিদিন বাড়ছে জ্বালানি, বরফ, খাবার ও শ্রমিকের খরচ। ফলে মাছ বিক্রি করে অনেকেরই ট্রলার পরিচালনার খরচ উঠছে না। কেউ কেউ লোকসান গুনছেন, আবার কেউ ধারদেনা করে টিকিয়ে রাখছেন জীবিকা।

জেলা মৎস্য অফিসের সরকারি তালিকা অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদীনির্ভর জেলে রয়েছেন প্রায় ৩৬ হাজার ৭০০ জন। তবে স্থানীয়দের হিসাবে নদী ও মাছের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল জেলের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। মেঘনা নদী ঘিরেই গড়ে উঠেছে তাদের জীবন-জীবিকা। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে ইলিশ আহরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এসব জেলে। বর্ষা শুরু হলে সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ নদীতে আসবে—এমন প্রত্যাশায় নৌকা ও ট্রলার নিয়ে নদীতে নামেন তারা।

একসময় লক্ষ্মীপুরের মেঘনায় শুধু ইলিশ নয়, বোয়াল, চিতল, রুই, কাতলা, আইড়, খলিশা, লাচু, মলা, ঢেলা, পুঁটি, সরপুঁটি, কৈ, শিং, মাগুর, পাবদা, বাইম, কাইক্যা, গইন্যা, শোল, গজারসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। নদীর মাছকে কেন্দ্র করে রায়পুর উপজেলার চরবংশী, নাইয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে জেলেপল্লি।

মাছের ওপর নির্ভর করে রায়পুর উপজেলায় গড়ে উঠেছে ১৫ থেকে ২০টি মাছের আড়ত। এসব আড়তকে ঘিরে নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ৪০টি বরফকল বা আইস ফ্যাক্টরি। মাছ ধরা, পরিবহন, বরফ উৎপাদন, আড়ত ও ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো মানুষের।

মজুচৌধুরীর হাট, রামগতির গজারিয়া, বয়ারচর, চর আবদুল্লাহ, তেলিরচর, আলেকজান্ডার, রায়পুরের জালিয়ার চর ও পানিরঘাটসহ বিভিন্ন মাছঘাটে রয়েছে এই মৎস্য অর্থনীতির বিস্তৃতি। কিন্তু নদী-সাগরে মাছের সংকট দেখা দেওয়ায় এখন সেই কর্মচাঞ্চল্যেও ভাটা পড়েছে।

কমলনগর উপজেলার প্রায় ৫০ বছর বয়সী জেলে গিয়াস উদ্দিন নদীর পাড়ে বসে হতাশার কথা জানান। তিনি বলেন, দিন-রাত নদীতে জাল ফেলেও যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকার তেলের খরচই উঠছে না। নদীতে ইলিশ নেই বললেই চলে। সারাদিনে আধা ডালা মাছও পাওয়া যায় না।

গিয়াস উদ্দিনের ভাষায়, একসময় নদীর পাড় দিয়ে পুঁটি মাছ পর্যন্ত গড়িয়ে যেত। এখন সেই মাছও নেই। তার অভিযোগ, সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে নদী ও খাল-বিলের মাছের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

চর জগবন্ধু এলাকার জেলে আবু ছায়েদ (৪৫) বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নদীতে জাল ফেলেও অনেক সময় খালি ডালা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। অথচ নদীতে যাওয়ার আগে জ্বালানি, খাবার ও অন্যান্য খরচ করতে হয়। মাছ না পাওয়ায় ধারদেনা শোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

আবু ছায়েদের মতো অনেক জেলেরই এখন একই অবস্থা। নদীতে মাছ শিকারে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় সংসার চালানো, নৌকার খরচ ও দাদনের টাকা পরিশোধ—সবকিছু নিয়েই অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। জেলেদের কেউ কেউ নদীতে নাব্যতা সংকটের কারণেও মাছের বিচরণ কমে যাওয়ার কথা বলছেন।

রামগতি মাছঘাটের ব্যবসায়ী মিনাজ মাঝি বলেন, গত বছর এই সময়ে তাদের ঘাট থেকে প্রায় ২০০ টন ইলিশ দেশের বিভিন্ন বাজারে যেত। কিন্তু এ বছর সেই চিত্র নেই। ঘাটে মাছই পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছরের সেই ব্যস্ততার কথা এখন অনেকটা গল্পের মতো মনে হচ্ছে।

নদী-সাগরে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় শুধু জেলেদের ঘরেই নয়, এর প্রভাব পড়ছে আড়ত, বরফকল, পরিবহন ও মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের জীবনে।

মাছ বিক্রেতা তাজল ইসলাম বলেন, সাধারণত এ সময়ে বাজারে ভরপুর ইলিশ থাকে। জেলেরা ট্রলারভর্তি মাছ নিয়ে ঘাটে আসেন। কিন্তু এবার জেলেদের অনেকেরই মাছ বিক্রি করে ডিজেলের খরচ পর্যন্ত উঠছে না। ফলে বাজারেও মাছের সরবরাহ কম।

আড়তদার তাফাজ্জল ইসলাম বলেন, মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় জেলেদের পাশাপাশি আড়তদাররাও সমস্যায় পড়েছেন। মাছ কম এলে কেনাবেচা কমে যায়, আর সরবরাহ কম থাকায় দামও বেড়ে যায়।

আরেক মাছ ব্যবসায়ী আবু তাহের বলেন, নদী ও সাগরে পর্যাপ্ত মাছ না থাকায় ব্যবসার স্বাভাবিক গতি নেই। মাছের সরবরাহ বাড়লে জেলে, আড়তদার ও ব্যবসায়ী—সবাই উপকৃত হবেন।

জেলে আরছব মোল্লা বলেন, ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বাজার-সদাই নিয়ে নদীতে গেলেও অনেক সময় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মাছ পাওয়া যায়। এতে খরচ তো ওঠেই না, উল্টো লোকসান হয়। এভাবে চলতে থাকলে জেলেদের পক্ষে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

শুধু ইলিশ নয়, পোয়াসহ অন্যান্য মাছের সরবরাহও কমেছে বলে জানিয়েছেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা। মাছের সংকটের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। সরবরাহ কম থাকায় একদিকে যেমন ইলিশের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাকেও বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।

লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় বাজার ও মৎস্য আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, সরবরাহ কম থাকায় ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের ইলিশ তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা কেজি দরে। ছোট আকারের ইলিশের দাম পড়ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা কেজি। এছাড়া রুই ও কাতলা মাছ আকারভেদে ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, পাঙ্গাস ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, সিলভার ও ব্রিগেড মাছ ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ক্রেতা নূর নাহার আক্তার বলেন, এমনিতেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম চড়া। এর মধ্যে যত দিন যাচ্ছে, মাছের দামও তত বাড়ছে। ফলে বাজারে এসে তাদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

ক্রেতা আমজাদ হোসেন ও আরিফুর রহমান বলেন, ইলিশ মাছ খাওয়া তারা অনেক বছর আগেই ছেড়ে দিয়েছেন। এখন পাঙ্গাস ও তেলাপিয়া মাছের দিকেই বেশি ঝুঁকেছেন। তাদের ভাষায়, পাঙ্গাসই এখন আমাদের কাছে ইলিশ মাছ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ যেন আমের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো অবস্থা।”

তারা আরও বলেন, আগে শুনতেন ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ইলিশ পাঠানোর কারণে দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ কমে যায়। কিন্তু এখন দেশের বাজারেই ইলিশের সরবরাহ কম, তার ওপর দামও অনেক বেশি।

ক্রেতাদের অভিযোগ, আগে যেসব মাছ দেড়শ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, সেগুলোর অনেকগুলো এখন ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ইলিশের বাজারেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। এরপরও বাজারে যে পরিমাণ ইলিশ আসছে, সেগুলোর আকাশছোঁয়া দামের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেরই তা কেনার সামর্থ্য হচ্ছে না।

মাছ বিক্রেতা রফিজল মাঝি, সুফিয়ান ও জয়দল খাঁ বলেন, স্থানীয় নদ-নদীতে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাইরে থেকে মাছ এনে বাজারের চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় মাছের বাজার চড়া। স্থানীয় নদ-নদীতে মাছের সরবরাহ বাড়লে বাজারে দামও কিছুটা কমে আসতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

জেলেদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন মাছের চেয়ে খরচ বেশি হয়ে যাওয়া। নদীতে মাছ ধরতে গেলে জ্বালানি, বরফ, খাবার ও শ্রমিকের পেছনে বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়। মাছ না পেলে পুরো খরচটাই লোকসানে পরিণত হয়। অনেক জেলে দাদন ও ধারদেনার ওপর নির্ভর করে নৌকা নিয়ে নদীতে নামছেন। ফলে মাছের সংকট দীর্ঘ হলে তাদের ঋণের বোঝাও বাড়তে থাকবে।

জেলেদের আশঙ্কা, নদীতে নাব্যতা সংকট, দূষণ, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারসহ নানা কারণে মাছের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় মেঘনা নদীতে মাছের প্রাচুর্যের পরিবর্তে দেখা দিতে পারে আরও বড় সংকট।

তবে জেলেদের এই হতাশার মধ্যে আশার কথা জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে নদী ও সাগরে ইলিশের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছিল। তখন অনেক জেলে ইলিশ আহরণে নদী ও সাগরে গিয়েছিলেন। বর্তমানে ভাটার কারণে ইলিশের বিচরণ কিছুটা কমেছে। আবার জোয়ার শুরু হলে ইলিশের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরও জানান, ইলিশের পিক সিজন এখনো চলমান। নদীর পাশাপাশি সাগর থেকেও ইলিশ বাজারে আসছে। তাই জেলেদের হতাশ না হয়ে অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। জোয়ারের সঙ্গে ইলিশের বিচরণ বাড়লে আহরণও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবুও আশায় বুক বাঁধছেন জেলেরা। তাদের প্রত্যাশা, নদী ও সাগরের পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আবারও মেঘনায় ফিরবে রুপালি ইলিশের ঝাঁক। জালভর্তি মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরবেন তারা। ফিরবে উপকূলের ঘাটের সেই চেনা কর্মচাঞ্চল্য, হাসি ফুটবে জেলে পরিবারের মুখে।