সামান্য এক কথার জেরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গড়ে উঠেছিল উত্তপ্ত ‘মব’ পরিস্থিতি! তবে সেই নাটকীয়তার আগুনে ঘি না ঢেলে স্বয়ং সরকারপ্রধানের মানবিক হস্তক্ষেপে এক আবেগঘন পরিণতির সাক্ষী হলো সবাই। গ্রেপ্তার আতঙ্ক কাটিয়ে সসম্মানে নিজ ঘরে ফিরে আবেগে ভাসলেন শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালন। সরকারপ্রধানের নজিরবিহীন সহানুভূতির জবাবে কৃতজ্ঞতায় ভেসে লালন স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘তাঁর এই মহানুভবতা ও মানবিক সিদ্ধান্তে আমি ও আমার পরিবার চিরকৃতজ্ঞ!’
ঘটনার পেছনের আসল প্রেক্ষাপট খোলাসা করতে গিয়ে দৌলতপুরের প্রাগপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক জানান, দশম শ্রেণির বাংলা ক্লাসে কয়েকজন শিক্ষার্থী ঠিকমতো রিডিং পড়তে না পারায় তিনি কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের মনযোগ ফেরাতে ও পড়তে উৎসাহিত করতে তিনি স্বভাবসুলভভাবেই বলে ফেলেছিলেন, ‘কয়েকদিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও তো জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার সময় কিছুটা আটকে গিয়েছিলেন। উনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় বাংলা চর্চার ঘাটতি থাকতে পারে। কিন্তু নিয়মিত ছাত্র হয়ে তোমরা কেন পারবে না?’ লালনের ভাষ্যমতে, প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না, তবে ক্লাসে ওই প্রসঙ্গ তোলাটা তাঁর ভুল হয়েছিল।
কিন্তু সেই কথা শিক্ষার্থীদের মুখে ছড়িয়ে পড়তেই পরদিন বুধবার সকালে প্রাগপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকে স্থানীয় অভিভাবক ও উৎসুক জনতা। তৈরি হয় এক আশঙ্কাজনক ‘মব’ পরিস্থিতি। সম্ভাব্য সহিংসতা ও শিক্ষকের নিরাপত্তার স্বার্থে খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে প্রাগপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নেয় দৌলতপুর থানা-পুলিশ। থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশের মানবিক আচরণের ভূয়সী প্রশংসা করে শিক্ষক লালন বলেন, ‘ওসি সাহেব আমাকে চেয়ারে বসিয়ে অত্যন্ত সম্মান জানিয়েছেন। পুলিশ কোনো ধরনের দুর্ব্যবহার করেনি।’
এদিকে খবরটি প্রধানমন্ত্রীর কানে পৌঁছানো মাত্রই তিনি নির্দেশ দেন শিক্ষককে দ্রুত সসম্মানে ও নিরাপত্তার সঙ্গে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তদারকিতে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তোহিদ বিন হাসান এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশের উপস্থিতিতে রাতেই পুলিশ দল লালনকে তাঁর প্রাগপুর পশ্চিমপাড়ার বাড়িতে পৌঁছে দেয়। শুধু পৌঁছে দেয়াই নয়, শিক্ষক লালনের স্থানীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে কি না, সে বিষয়েও ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাতেই শিক্ষককে সসম্মানে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তোহিদ বিন হাসান জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়ার পর দৌলতপুর থানা পুলিশ ও এসি ল্যান্ড শিক্ষককে সসম্মানে বাড়িতে পৌঁছে দেন। স্থানীয়ভাবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী খোঁজ নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
চরম উত্তেজনা দিয়ে শুরু হওয়া একটি ঘটনা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সৌজন্য ও পরম মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গোটা দেশের মানুষের কাছে।