ছয় ঘণ্টা পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল শুরু

নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের সঙ্গে সংগতি রেখে পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করা এবং অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর, পল্লীবিদ্যুৎ ও চন্দ্রা এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা।

অবরোধ অপসারণকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে পুলিশ ও শ্রমিকসহ কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাসের শেল (টিয়ারশেল) ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষ চলার সময় পুলিশের একটি ভ্যানসহ ১৫টি যানবাহনে ভাঙচুর ও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। দ্বিদুই দফায় ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও পুলিশ সঙ্গে সংঘর্ষ শেষে ছয় ঘণ্টা পর রাত ৮টার দিকে সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।

Dhaka-Tangail Highway
যেভাবে শুরু আন্দোলন ও সহিংসতা:
শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুপুরের টিফিন বিরতির সময় কাজ বন্ধ করে ইন্টারস্টপ অ্যাপারেলস লিমিটেডের শ্রমিকেরা প্রথম চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে পাশের ডিভাইন টেক্সটাইলসহ আশপাশের একাধিক কারখানার শ্রমিকেরা তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। উত্তপ্ত পরিস্থিতি এড়াতে ও অপ্রীতিকর ঘটনা রুখতে চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত অন্তত ২০টি তৈরি পোশাক কারখানায় সাময়িক ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। ছুটি পাওয়া শ্রমিকদের একটি অংশও পরবর্তীতে রাজপথের বিক্ষোভে যোগ দেয়।

বিকেল গড়াতেই পুলিশ শ্রমিকদের সরে যাওয়ার অনুরোধ জানালে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। একপর্যায়ে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করলে শ্রমিকেরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে শিল্প পুলিশ ও থানা পুলিশ যৌথভাবে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানান, জনমালের নিরাপত্তা এবং ভাঙচুর রোধে পুলিশ বাধ্য হয়ে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

Labour Unrest 02
শ্রমিকদের আকুতি ও শ্রমিক নেতাদের আহ্বান:
আন্দোলনরত ইন্টারস্টপ কারখানার লাইনম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে যে বেতন পাই, তা দিয়ে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। চাল, ডাল, তেলসহ সবকিছুর দাম বাড়লেও আমাদের বেতন বাড়েনি, ওভারটাইমের সুযোগও কমে গেছে। আমরা কাজ করতে চাই, কিন্তু বাঁচতে তো হবে।

একই কারখানার সুইং অপারেটর পারভীন আক্তার বলেন, ঘরভাড়া, সন্তানের লেখাপড়া আর বাজার খরচ চালাতে গিয়ে দিশেহারা অবস্থা। ৩০ হাজার টাকা বেতন আমাদের মৌলিক দাবি। দাবি না মানা পর্যন্ত এই লড়াই চলবে।" ডিভাইন টেক্সটাইলের শ্রমিক কবির হোসেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আজকে টিয়ারশেলে আহত হয়ে চলে গেলেও রোববার সকাল থেকে আমরা আবার রাজপথে আন্দোলন নামব।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান শ্রমিকদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদের জন্য অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে ৩০ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করা জরুরি। তবে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি কিংবা জানমালের ক্ষতি না করে শান্তিকামী উপায়ে কর্মসূচি পালন করতে আমরা শ্রমিকদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।

Labour Unrest 01
১৫ কিলোমিটার জুড়ে যানজট ও যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ:
সাড়ে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় মহাসড়ক অবরুদ্ধ থাকায় চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী ও আশপাশের প্রায় ১৫ কিলোমিটার অংশে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়। ফলে দূরপাল্লার গণপরিবহন ও পণ্যবাহী ট্রাক আটকে পড়ে হাজার হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক যাত্রীকে বাস থেকে নেমে মাইলের পর মাইল হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হতে দেখা যায়। রাত ৮টার পর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।