পটুয়াখালীর উপকূলে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলারডুবির ৪২ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ ছয় জেলের কোনো সন্ধান মেলেনি। কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশ ও স্থানীয় জেলেদের সমন্বয়ে সাগরে টানা উদ্ধার অভিযান চললেও মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এদিকে তাদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ক্ষীন হতে থাকায় জেলেদের বাড়ি জেলার গলাচিপা উপজেলার পানপটি ইউনিয়নের খরিদা ও তুলারাম গ্রামে চলছে স্বজনদের আহাজারি।
এর আগে গত রোববার (৫ জুলাই) রাত ১০টার দিকে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবি উপকূল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে প্রবল ঢেউ ও তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে ১১ জন জেলেসহ ট্রলারটি উল্টে যায়। দুর্ঘটনার পর পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ছয়জন।
ট্রলারটি উল্টে যাওয়ার পর ভেতরে আটকে পড়া জেলেদের আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু উত্তাল ঢেউ ও তীব্র স্রোতের কারণে কাউকে উদ্ধার করার মতো পরিস্থিতি ছিলো না।
ট্রলারের মালিক ও উদ্ধার হওয়া জেলে এমাদুল সিকদার জানান, শনিবার দিবাগত রাতে কলাপাড়ার মহিপুর মৎস্য বন্দর থেকে তারা সাগরে রওনা হয়েছিলেন। রোববার রাতে ট্রলারটি উল্টে যাওয়ার পর ভেতরে আটকে পড়া জেলেদের আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু উত্তাল ঢেউ ও তীব্র স্রোতের কারণে কাউকে উদ্ধার করার মতো পরিস্থিতি ছিলো না।
তিনি বলেন, কিছুক্ষণ পর ছয়জন ট্রলারের ভেতর থেকে বের হতে পারলেও ফোরকান, সায়েম ও এমাদুল খাঁ আর বের হতে পারেননি। আমরা আটজন উল্টে থাকা ট্রলারের ফ্যান ধরে প্রায় ছয় ঘণ্টা ভেসে ছিলাম। পরে জীবন বাঁচানোর জন্য পাঁচজন একটি ফ্লুট ধরে অন্যদিকে ভেসে যাই। পরে একটি মাছ ধরার ট্রলার আমাদের উদ্ধার করে।
আমরা ট্রলারের ভাঙা অংশ ও একটি বয়া ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাগরে ভেসে ছিলাম। চারদিকে শুধু অন্ধকার আর উত্তাল ঢেউ। মনে হচ্ছিলো আর বাঁচবো না।
উদ্ধার হওয়া আরেক জেলে বায়েজিদ বলেন, হঠাৎ করেই আবহাওয়া ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। আমরা ট্রলারের ভাঙা অংশ ও একটি বয়া ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাগরে ভেসে ছিলাম। চারদিকে শুধু অন্ধকার আর উত্তাল ঢেউ। মনে হচ্ছিলো আর বাঁচবো না।
মঙ্গলবার সরেজমিনে খরিদা ও তুলারাম গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিখোঁজ জেলেদের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। নিখোঁজ জেলেরা হলেন—তুলারাম গ্রামের এমাদুল খাঁ (৪৫), খরিদা গ্রামের হারুন (৪৫), গজালিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইছাদী গ্রামের ফোরকান সিকদার (৫৫), তার ছেলে সায়েম (২০), আল-আমিন (২২) এবং পক্ষিয়া গ্রামের আক্কাস (২৫)।
নিখোঁজ হারুনের পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাগরে মাছ ধরছেন, কখনও এমন বিপদে পড়েননি। তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় পুরো পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তায়।
ঘটনার পর সোমবার ট্রলার মালিকের বাবা মো. ইদ্রিস সিকদার গলাচিপা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিখোঁজ প্রত্যেক জেলের পরিবারকে প্রাথমিক সহায়তা হিসেবে সাত হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
কুয়াকাটা নৌ-পুলিশের পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে নৌ-পুলিশ সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। কোস্ট গার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, ট্রলারডুবির খবর পাওয়ার পরপরই রাঙ্গাবালী ও কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। কোস্ট গার্ড নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। আমি নিখোঁজ প্রত্যেক জেলের বাড়িতে গিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিয়েছি এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত জেলেদের দেখে এসেছি।