বিকেলেও সহকর্মীদের সঙ্গে হাসিখুশি সময় কাটিয়েছেন পটুয়াখালীর গলাচিপার উলানিয়া হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক দীপা রানী দাস (৫১)। কিন্তু সেই বিকেলের রেশ কাটতে না কাটতেই গভীর রাতে শ্বশুরবাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তার ঝুলন্ত মরদেহ। দীপা রানীর এই আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারছেন না তার সহকর্মীরা। স্বামীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ তুলে এই মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ভয়ঙ্কর সত্য লুকিয়ে আছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে দশমিনা উপজেলার রনগোপালদী ইউনিয়নের মধ্য রনগোপালদী গ্রামে নিজ ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় দীপা রানী দাসের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
দীপা গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার হিজলবাড়ি গ্রামের প্রয়াত যোগেশ চন্দ্র দাসের মেয়ে এবং উলানিয়া হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের সহকারী শিক্ষিকা ছিলেন। তার স্বামী সব্যসাচী দাস দশমিনার রনগোপালদীর বাসিন্দা।
উলানিয়া হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকরা জানান, দীপা রানী দাস দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর নির্যাতনের শিকার ছিলেন। প্রাণনাশের শঙ্কায় তিনি একসময় প্রায় এক বছর উলানিয়ায় বাসা ভাড়া করে আলাদাভাবে বসবাস করেছিলেন। পরে তার স্বামী সব্যসাচী দাস তাকে বুঝিয়ে আবার বাড়িতে নিয়ে যান।
শিক্ষকদের অভিযোগ, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ মীমাংসার জন্য তারা অন্তত দুইবার পারিবারিকভাবে বসেছিলেন, কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে দীপা রানী দাস পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন। এমনকি তার স্বামীর কাছ থেকে ভবিষ্যতে আর নির্যাতন করবেন না—এ মর্মে পুলিশের মাধ্যমে একটি মুচলেকাও নেওয়া হয়েছিলো। প্রায় দুই বছর আগে দীপার জীবন হুমকির মুখে পড়লে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেছিল বলেও সহকর্মীরা জানান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো আইনি সুরক্ষাই দীপা রানীকে বাঁচাতে পারলো না।
দীপা রানীর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন তার সহকর্মী শিক্ষিকা বিথিকা দেবনাথ। সেখানে তিনি দীপা রানীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সুষ্ঠু তদন্তের আহবান জানিয়েছেন।
দীপিকা দেবনাথ তার পোস্টে লেখেন, মৃত্যুর আগের বিকেলেও তিনি দীপা রানীকে হাসিখুশি দেখেছিলেন। তাই হঠাৎ এমন মৃত্যুকে তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তিনি লিখেছেন, ‘কত লড়াকু নারী ছিলেন আপনি! কখনো তো আপনাকে হতাশ হতে দেখিনি। তাহলে কি অন্য কিছু হয়েছিল? সত্যিটা কি ভয়ংকর কিছু?’
পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, জীবিত অবস্থায় তিনি দীপা রানীকে বারবার স্বামীর বাড়িতে ফিরে না যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু দীপা রানী স্বামী-সনাতন ও শাশুড়িকে নিয়ে সংসার করার ইচ্ছার কথাই বারবার জানাতেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নিহতের স্বামী সভ্যসাচী দাস বলেন, এসব ঘটনা তিন বছর আগের। এখন সেগুলো টেনে আনার কারণ কী? আমার স্ত্রী কেন আত্মহত্যা করেছেন, তা আমি জানি না।
দশমিনা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আতিকুল রহমান বলেন, শিক্ষিকার মৃত্যুর ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।