সাত খাল মাড়িয়ে স্কুলে শিশুরা, পঞ্চমের পর পড়া বন্ধ

বাড়ি থেকে বের হলেই সামনে খাল। একটি নয়, দুটি নয়—পরপর পাঁচ থেকে সাতটি খাল পেরিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরকারফারমা এলাকায় কোনো নিরাপদ রাস্তা ও সাঁকো না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, এমনকি খাল সাঁতরে স্কুলে পৌঁছাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। জোয়ার ও বর্ষার দিনে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় থমকে যাচ্ছে এখানকার অন্তত দেড় হাজার মানুষের জীবনযাত্রা ও শিক্ষা।

প্রায় ৭০০ একর জমি নিয়ে গঠিত ১০০ বছরের পুরনো চরকারফারমা চরে প্রায় ৪০০ পরিবারের বাস, যার মোট জনসংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। ২০১৮ সালে এখানে স্থাপিত ‘চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’টি চরের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একমাত্র পাকা ভবন। তবে বিদ্যালয়ে আসার নিরাপদ সড়ক বা পর্যাপ্ত সাঁকো না থাকায় আশপাশের পাঁচটি খাল সাঁতরে বা পার হয়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে ক্লাসে আসতে হয়।

সরেজমিন, গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের বিচ্ছিন্ন চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি চরের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একমাত্র পাকা ভবন। কিন্তু চরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে পাঁচ থেকে সাতটি খাল পার হতে হয়। ব্যাগে অতিরিক্ত পোশাক নিয়ে অনেককে সাঁতার কেটে স্কুলে আসতে হয়। যারা সাঁতার জানেনা, তাদের অভিভাবকরা কোলে করে প্রতিদিন খালগুলো পার করে দিচ্ছেন। আবার সাঁকো পার হতে গিয়ে জোয়ারের স্রোতে ভেসে দুর্ঘটনায় পড়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

শিক্ষার্থীরা জানায়, চরম ভোগান্তি পেরিয়ে তাদের বিদ্যালয়ে আসতে হয়। ব্যাগে অতিরিক্ত পোশাক বা লুঙ্গি নিয়ে খাল সাঁতরে এসে পরে বিদ্যালয়ের পোশাক পরতে হয় তাদের। সাঁকো দিয়ে আসতে গিয়ে জোয়ারের স্রোতে পড়ে দুর্ঘটনার শিকারও হতে হয়েছে কাউকে কাউকে।

যোগাযোগের এই করুণ অবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে নারী শিক্ষার্থীরা। খাল সাঁতরে বা খালি গায়ে স্কুলে আসা সম্ভব না হওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেক অভিভাবক তাদের মেয়েদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপযুক্ত যোগাযোগের অভাবে গত ১২ বছরে এই চরের কোনো সন্তানকে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করানো সম্ভব হয়নি। চরে কোনো ডিগ্রিধারী বাসিন্দা না থাকায় বিদ্যালয়ের নিয়মিত পরিচালন কমিটিও গঠন করা যায়নি।

চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নিসার উদ্দিন জানান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই প্রতিদিন খাল পেরিয়ে চরম ঝুঁকি ও ভোগান্তি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। দ্রুত রাস্তা নির্মাণ ও খালের ওপর সাঁকোর ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে গলাচিপা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগির জানান, এলাকাটি নিচু হওয়ায় ২৪ ঘণ্টায় দুই বার জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। খালের ওপর সাঁকো নির্মাণ ও রাস্তা তৈরির বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং প্রকৌশলীকে জানানো হয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

চরের অধিবাসীদের দাবি—কোমলমতি শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত যেন খালের ওপর সাঁকো, চলাচলের পাকা রাস্তা এবং বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পেতে একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়।