মধ্যরাত থেকে শুরু মা ইলিশের সুরক্ষায় নিষেধাজ্ঞা

দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলজুড়ে নেমে এসেছে এক বিষাদময় নীরবতা। প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা 'মা ইলিশ' সুরক্ষায় বুধবার মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের টানা ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান’। সরকারি এই কড়া ফরমানে রাত বারোটার পর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের সব নদ-নদী এবং বঙ্গোপসাগরে ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও মজুত পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে।

তবে, ইলিশের মৌসুম শেষ হলেও দাম ছিল আকাশচুম্বী। মাছের দেখা না মেলায় হতাশ মৎস্যজীবীরা। গত ৩ মাসে গত বছরের তুলনায় ইলিশ আহরণ হয়েছে কম। ফলে প্রতিবছরের এই সময় সরকারের নিয়মিত নিষেধাজ্ঞাতে থমকে যাচ্ছে বরগুনার লক্ষাধিক জেলে ও মৎস্যজীবীর জীবন-জীবিকা!

নিষেধাজ্ঞার আনুষ্ঠানিক বাঁশি বাজার ২৪ ঘণ্টা আগেই সাগর থেকে পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও তালতলীর ফকিরহাটে ভিড়তে শুরু করেছে শ শ মাছধরা ট্রলার। ঘাটে ঘাটে এখন খালি ট্রলার থেকে জাল-দড়ি গুটিয় ঘরে ফেরার তাড়াহুড়ো।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাট পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। ঘাটের ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জিএম মাসুদ শিকদার জানিয়েছেন, মধ্যরাত থেকেই মাছ অবতরণসহ ঘাটের যাবতীয় বাণিজ্যিক হাঁকডাক বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

তবে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ হলেও বরগুনার উপকূলে এখন জ্বলছে ক্ষোভ ও চরম অনিশ্চয়তার আগুন! ২২ দিনের এই বেকার সময়ে সরকারি সহায়তার চাল নিয়ে জেলেদের মাঝে বিরাজ করছে তীব্র অসন্তোষ। তাঁদের স্পষ্ট অভিযোগ, বিগত দিনের মতো এবারও সরকারি সহায়তার চাল বিতরণে ইউপি সদস্যদের স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির ভূত চেপে বসেছে।

বরগুনায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৫২ হাজার ২৭৪ জন হলেও সরকারের তরফ থেকে এবার চালের বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৩৯ হাজার ৪৬৯ জনের জন্য (মোট ৯৮৭ মেট্রিক টন)। অর্থাৎ তালিকার বাইরে থেকে বাদ পড়া হাজার হাজার প্রকৃত জেলে এবারও অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হবেন।

বরগুনা সদরের 'এফবি হাওলাদার' ট্রলারের জেলে সবুজ মৃধা আক্ষেপ করে বলেন, "২২ দিনের জন্য সরকার মাত্র ২৫ কেজি চাল দেয়। বর্তমান বাজারে এই সামান্য চালে চার-পাঁচজনের পরিবার চালানো অসম্ভব!" চালের সাথে নগদ আর্থিক সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, পাথরঘাটার পদ্মা এলাকার প্রবীণ জেলে নুরু মিয়া তুলেছেন আরও গুরুতর এক অভিযোগ। তিনি জানান, দেশীয় সাধারণ জেলেরা জাল গুটিয়ে ঘরে বসে থাকলেও সাগরে অসাধু জেলেদের ট্রলিং বোটগুলো অবাধে ইলিশ শিকার চালিয়ে যায়। পাশাপাশি ভারতীয় জেলেদের জলসীমায় অনুপ্রবেশ রুখতে ব্যর্থ হলে এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সমস্ত সুফল ভেস্তে যাবে।

অবশ্য মৎস্য প্রশাসন হুঁশিয়ারির সুর ধরে রেখেছে কঠোর। বরিশাল বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. কামরুল হাসান জানিয়েছেন, পিরোজপুরে ইতোমধ্যেই চাল বিতরণ শেষ হয়েছে এবং বরগুনাসহ অন্যান্য জেলাতেও প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই চাল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। একইসাথে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ সাগরে নামার চেষ্টা করলে কিংবা ইলিশ শিকারের পাঁয়তারা করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন তিনি।