সরাইল গ্রে-হাউন্ডের ভবিষ্যৎ কী?

প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও পরিচর্যার অভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের গ্রে-হাউন্ড কুকুর। এক সময় উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে এই জাতের কুকুর লালন পালন হলেও এখন মাত্র একটি পরিবারের কাছে রয়েছে কয়েকটি কুকুর। এগুলো লালন পালনেও হিমশিম খেতে হয় তাদের।

লম্বা লেজ ও কান, গায়ে ছোপ ছোপ ফোটা। রং সাধারণত সাদা-কালো আর সাদা-বাদামি। চোখেমুখে সবসময় শিকারের তীক্ষ্ণতা। এক সময় বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়া সরাইলের গ্রে-হাউন্ড কুকুর।

শুধু আকৃতি বা দৈহিক গঠনের দিক থেকে গ্রে-হাউন্ড অন্যান্য কুকুরের চেয়ে আলাদা তা নয়। আচরণের দিক থেকেও আলাদা। হাঁটাচলা বা দৌড় দেওয়ার ভঙ্গিও আলাদা। ঘুমের অভ্যাসও অন্য কুকুরের চেয়ে ভিন্ন। শুধু ঘ্রাণশক্তি নয়, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তির মাধ্যমে শিকার ধরা এদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দ্রুতগামী কুকুরটি অন্যান্য কুকুরের মতো আহ্লাদী হলেও অপরিচিতদের আদর তার পছন্দ নয়। প্রভুভক্ত শান্ত এই জাতের কুকুর শত্রুর জন্য খুবই হিংস্র ও ভয়ংকর। দিনে-রাতে মালিকের বাড়ি নিরাপত্তায় জুড়ি মেলা ভার।

সরাইলের নোয়াগাঁও-এ এক সময় প্রায় প্রতিটি পরিবারের লালন-পালন হতো এই গ্রে-হাউন্ড। রপ্তানি হতো দেশ-বিদেশে। তবে খাদ্য ও ওষুধসহ সব উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই কুকুর লালন-পালন ছেড়ে দিয়েছেন প্রায় সবাই।

স্থানীয়রা জানান, এই কুকুর লালন-পালনের ব্যয়সাপেক্ষ। যারা বাণিজ্যিক কারণে এই জাতের কুকুর লালন-পালন করতে তারা পিছিয়ে যাচ্ছে। মূল জাতের গ্রেহাউন্ডের বাচ্চা বিক্রি হয় ৩০-৩৫ হাজার টাকায়। আর শংকর জাত হলে ১৮-২০ হাজার টাকায়।

বর্তমানে সরাইলের গ্রে-হাউন্ড লালন-পালন করে মাত্র একটি পরিবার। তবে প্রশাসন উদ্যোগী না হলে এই কুকুর হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় তারা।

ওই পরিবারের সদস্য রবিদাস বলেন, আমার দাদা এই কুকুর পালতেন। বাবাও পালতেন। এখন আমরা পালি।

আরেক সদস্য রতন দাস বরেন এই জাতের কুকুরের লালল-পালনের সমস্যার কথা। তিনি বলেন, এদের চিকিৎসার অভাব। খানাপিনার অভাব। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। এদের মাংস খাওয়াতে হয়। দুধ খাওয়াতে হয়। প্রচুর পরিচর্যা করাতে হয়। চোখে চোখে রাখতে হয়। পৃষ্ঠপোষকতা এবং পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এই জাতের কুকুর।

এক দশক আগেও র‌্যাবের ডগ স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছে সরাইলের গ্রে-হাউন্ড। এই প্রজাতির কুকুর সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাধারণ গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি এসব নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে। সরাইল কুকুরের সংরক্ষেণ জন্য প্রানিসম্পদ অধিদপ্তরের কোনো কার্যক্রম নেই।  

বাংলাদেশে এই কুকুরের উৎপত্তির সঠিক কোনো ইতিহাস নেই। সরাইলের গ্রে-হাউন্ড কুকুর নিয়ে বেশ কিছু জনশ্রুতি স্থানীয়দের কাছে প্রচলিত আছে। কথিত আছে, একবার সরাইলের দেওয়ান মজতুবা আলী হাতি নিয়ে কলকাতা যাচ্ছিলেন। পথে এক ইংরেজ সাহেবের কাছে একটি সুন্দর কুকুর দেখতে পান। তিনি কুকুরটি কেনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে তিনি একটি হাতির বিনিময়ে ইংরেজ সাহেব থেকে ওই কুকুরটি (মাদি-স্ত্রী জাতের) নিয়ে আসেন।

দেওয়ান মজতুবা আলী একদিন হাতির পিঠে চড়ে বনে শিকারে বের হয়েছিলেন। একপর্যায়ে মাদি কুকুরটি বনে হারিয়ে যায়। বেশ কিছুদিন পর গর্ভবতী হয়ে কুকুরটি ফিরে আসে। কদিন পরই দেওয়ানের বাড়িতে কুকুরটি কয়েকটি বাচ্চা দেয়। দেখা যায়, এসব বাচ্চা সাধারণ কুকুরের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাচ্চাগুলোর সঙ্গে বাঘের বেশ মিল আছে। ধারণা করা হয়, নেকড়ের সঙ্গে দেওয়ানের কুকুরের মিলন থেকে ওই বাচ্চা

১৯৮৩ সালে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় উপজেলা সদরে একটি গ্রে-হাউন্ড কুকুর সংরক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিলো। তবে উপযুক্ত চিকিৎসা, সুষ্ঠু পরিচালনা ও আর্থিক সংকটের কারণে কয়েক বছর পরই কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। উপজেলা সদরের বড়দেওয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান ঠাকুর ২০০১ সালে সরাইলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কুকুর প্রজননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগটিও টেকেনি।

বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যবাহী সরাইলের বিরল প্রজাতির মূল্যবান গ্রে-হাউন্ড কুকুর বিলুপ্ত হতে চলেছে।