যাত্রাবিরতি হোটেলগুলোর আড়ালে মাদকের জমজমাট কারবার

মহাসড়কে যাত্রাবিরতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অনেক রেস্টুরেন্টেই খাবার ব্যবসার আড়ালে চলছে রমরমা মাদক কারবার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের বেশিরভাগ রেস্তোরাঁয় এমন মাদক কারবারের প্রমাণ মিলেছে। চালকদের টার্গেট করে গড়ে উঠেছে এই সিন্ডিকেট। একাত্তর টেলিভিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন মাদক কারবারের ভয়ংকর চিত্র। 

ঘটনাস্থল কুমিল্লার দাউদকান্দি। সেখানে সেখানে এক মাদক বিক্রেতার কাছে জানতে চাওয়া হয়, থেমে থাকা ট্রাকচালকের কাছে কি বিক্রি করলেন? এমন প্রশ্ন করতেই দৌঁড়ে পালালেন এই ব্যক্তি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রাকটিও বেপরোয়া গতিতে জায়গা ছাড়লো।

ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের দাউদকান্দি এলাকার চিত্র এটি। চালকের কাছে কি বিক্রি করা হয়েছে তা জানতে দৌড় পালানো লোকটির পিছু নিয়েও তার পাত্তা মিললো না। পরে জানা গেলো তিনি সেখানে একটি রেস্তোরার ম্যানেজার, নাম আক্কাস। 

মহাসড়কে যাত্রাবিরতির জন্য কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় চারশ’রও বেশি রেস্তোরাঁ। অর্থাৎ কিলোমিটার প্রতি প্রায় চারটি। একাত্তরের কাছে তথ্য আছে, এই রেস্তোরার একটা বড় অংশে খাবারের আড়ালে মূলত চলে মাদক কারবার। যাদের মূল টার্গেট বিভিন্ন পরিবহনের চালকরা। 

পাওয়া তথ্য যাচাই করতে ছদ্মবেশে এসব রেস্তোরাঁয় অভিযানে নামে একাত্তর টিভির অনুসন্ধানী দল। সেখানের কদমতলি পাড় না হতেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে কয়েকজন যুবক। দাঁড়াতেই কাছে এগিয়ে আসলো তারা, চাহিবামাত্র মিললো মাদকও। 

এবার সত্যতা যাচাইয়ে একটি রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করে টিম একাত্তর। গাড়ি থামার আগেই এগিয়ে আসে ম্যানেজার। পরে রেস্তোরার মধ্যে বসে বিভিন্ন কথাবর্তার ফাঁকে চলতে থাকে মাদক নিয়ে কথা চালাচালি। অল্প সময়ের ব্যবধানে নিজের প্রতিষ্ঠানের সেবার মান বোঝাতে মাদক নিয়ে হাজির ম্যানেজার। 

এবার রেস্টুরেন্টেই সেবন করে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে সঙ্গে সঙ্গে দেখিয়ে দেওয়া হয় পাশের টিনসেড ঘর। ভেতরে ঢুকতেই বোঝা যায় মাদকসেবীদের জন্য আলাদাভাবে নির্মাণ করা হয়েছে এ জায়গা। 

এমন সাঁড়ি সাঁড়ি ঘরের দেখা মেলে ঢাকা-কুমিল্লা হাইওয়ের ধার ঘেষে। সেগুলোর ভেতরে প্রবেশ করতেই বোঝা যায় মাদক সেবনের জন্যই আলাদাভাবে নির্মাণ করা হয়েছে এসব ঘর। এবার কিছুক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে চলমান যানবাহনগুলোর ওপর নজর রাখা যাক।  

হঠাৎ সন্দেহজনক একটি ট্রাককে কিছু একটা নিতে দেখে তার পিছু নেয় টিম একাত্তর। প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর ট্রাক থামলে, প্রথমে অস্বীকার করলেও হাতেনাতে মাদকসহ ধরা পড়ে যায় হেলপার। চালকদের হাতে এভাবে মাদক তুলে দেয়া সড়ক দুর্ঘটনার যে অন্যতম কারণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

তারপরও পুলিশ নীরব কেন? সংশ্লিষ্ট হাইওয়ে থানায় যাওয়ার আগে থানা ঘেষা একটি রেস্টুরেন্টের চিত্র দেখতে যায় একাত্তর টিভি। ভেতরে ঢুকেই খাবার অর্ডার করে একাত্তর টিম। খাবার পরিবেশন করতে করতেই অচমকা আর কি লাগবে সেই প্রস্তাব দিয়ে বসে হোটেল ম্যানেজার। 

সন্ধ্যা হয়ে আসায় কত সময় লাগবে সেকথা জানতে চাওয়া মাত্রই দোকানের ক্যাশ থেকেই বের করে দেওয়া হয় ইয়াবা। ফেনসিডিল চাইলে ১০ মিনিট সময় চায় ম্যানেজার। পরে সেখানেই মাদক সেবনের আবদার করা হলে সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ে যাওয়া হয় কেবিনে। সহযোগী হিসেবে দিয়ে দেয়া সেখানে অপেক্ষারত এক ট্রাক চালককেও। 

কিছুক্ষণ পরই চলে আসে ফেনসিডিল। অপেক্ষমান সময়ে অনেক গাড়িকেই থামতে দেখা যায় হাইওয়ে থানার ধার ঘেষে গড়ে ওঠা রেস্তোরাঁটিতে। মালিক জানায় কাউকেই তোয়াক্কা করে না তারা। 
এবার ছদ্মবেশে ছেড়ে সাংবাদিক হিসেবে রেস্তোরাটিতে যায় টিম একাত্তর। ভয়ে এলেমেলো কথা শুরু করে দেয় তারা। অকপটে জানিয়ে দেয় মাদক না রাখলে কোনো গাড়িই থামে না রেস্তোরাঁয়। 

ম্যানেজারকে থানায় যেতে বলা হলে হাতেপায়ে ধরা শুরু করে। কোনো ক্ষতি করবো না এমন শর্তে তাকে থানায় নিতে রাজি করানো হয়। তবে হাইওয়ে থানা পুলিশের বক্তব্য ভড়কে ওঠার মতোই, তারা নাকি এর কিছুই জানে না।

প্রতিদিন যে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে ১৫ জনের বেশি মানুষ- সে দেশে চালকদের হাতে এভাবে মাদক তুলে দেওয়ায় অভয়ারণ্য কেনো করে রাখা হয়েছে যাত্রাবিরতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব রেস্তোরাঁয়- তা নিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় চাপান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ওপর। 

পরে সেই দপ্তরের সঙ্গেই কথা বলে টিম একাত্তর। একে অন্যের ঘারে দায় না চাপিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা কমাতে বন্ধ হবে এসব অভয়ারণ্য সে প্রত্যাশাই সবার।