শ্রমজীবী নারীদের জীবনযুদ্ধ

স্বামী হারানো, সংসার ভেঙে যাওয়া কিংবা নদীভাঙনের মতো একের পর এক প্রতিকূলতা। তবুও দমে যাননি লক্ষ্মীপুরের অদম্য নারীরা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে আর দুমুঠো ভাতের জোগানে তারা চালিয়ে যাচ্ছেন নিরন্তর সংগ্রাম। জেলার কমলনগর উপজেলার মাতাব্বর হাট, নয়াবাড়ি ও বিভিন্ন চরাঞ্চলে প্রতিদিন এমন শত শত নারীর হাড়ভাঙা খাটুনির দৃশ্য চোখে পড়ে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘিরে লক্ষ্মীপুরের এই শ্রমজীবী নারীদের জীবনযুদ্ধের গল্পগুলো সমাজ ও অর্থনীতিতে তাদের অবদানের কথা নতুন করে জানান দিচ্ছে। তবে কঠোর পরিশ্রম করলেও তারা এখনো বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা থেকে।

জীবনযুদ্ধের নানা গল্প

women-luxmipur1

কমলনগর উপজেলার চর লরেঞ্চ এলাকার ৩০ বছর বয়সী ফারহানা বেগম। স্বামী চলে যাওয়ার পর তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট মেয়ে ফারিয়াকে নিয়ে তার সংসার। অন্যের বাসায় কাজ করে কোনোমতে দিন পার করছেন তিনি। বললেন, শত কষ্টের মধ্যেও মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে চাই।

একই উপজেলার কাজল রেখা (৪২) জানান তার সংগ্রামের কথা। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র থাকায় তিন সন্তান রায়হান, শানিহন ও রিয়ানকে নিয়ে তিনি একা লড়ছেন। কখনো রাস্তার মাটি কাটা, আবার কখনো হোটেলে কাজ করে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছেন তিনি।

অন্যদিকে চর মাটির গ্রামের শাহিদা বেগম (৪০) স্বামী হারিয়েছেন অনেক আগে। ছেলে শাহাতাদ (১০) ও মেয়ে ছুমাইয়াকে (১৪) নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তার। আবার অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে সন্তানদের নিয়ে টিকে থাকার লড়াই করছেন ৪৮ বছর বয়সী নাছিমা বেগম। তার অভিযোগ, দিনরাত পরিশ্রম করেও ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না তারা।

ভোটার হিসেবে সচেতনতা ও প্রত্যাশা

women-luxmipur2

লক্ষ্মীপুর জেলায় মোট ১৬ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার। এবারের প্রেক্ষাপটে লক্ষ্মীপুরের নারীরা শুধু ভোটার হিসেবেই নয়, বরং নিজেদের অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাদের প্রত্যাশা—সমান অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ।

বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য

নারীদের এই দুরবস্থা নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি তানিয়া রব বলেন, নারীদের উন্নয়নের জন্য শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। লক্ষ্মীপুর কৃষি ও কুটির শিল্পের জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা। স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে এখানকার নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা সম্ভব।

নারীর ক্ষমতায়নে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে লক্ষ্মীপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সুলতানা জোবেদা খানম বলেন, আইজিই প্রকল্পসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে অসহায় ও দুস্থ নারীদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে কেবল আইন যথেষ্ট নয়, বরং এর কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। শিক্ষা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই হবে এবারের নারী দিবসের মূল সার্থকতা।