- নিহতদের মধ্যে শিশুসহ ৬ জনের পরিচয় শনাক্ত
- ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই চলছিলো রিসোর্টটি
- জুনে নোটিশ দেয়া হলেও তোয়াক্কা করা হয়নি
- রিসোর্টে ছিলো না অগ্নিনির্বাপনের কোন ব্যবস্থা
- রান্নার চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে
- রিসোর্ট মালিক তানভির ঘটনার পর আত্মগোপনে
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী পাটোয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন এলাকায় কাঠের তৈরি তিনতলা টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় সংঘটিত ভয়াবহ আগুনে ১০ জন পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর সব তথ্য সামনে এসেছে। ফায়ার সার্ভিসের স্পষ্ট সতর্কতা ও লাইসেন্স ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে রিসোর্টটি পরিচালনা করা হচ্ছিলো বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।
শনিবার দুপুরে রাজধানীতে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে এক প্রেস কনফারেন্সে তিনি জানান, গত জুনেই রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ই-ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার জন্য ২১ দিনের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা তোয়াক্কা না করেই কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল কর্তৃপক্ষ।
আগুনের সূত্রপাত ও ভয়ানক পরিস্থিতি
শনিবার সকালে ঘটা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ জনে। এছাড়া দগ্ধ অবস্থায় আরও ছয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে ইতিমধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে।
তাঁরা হলেন- ঢাকার ইসরাত জাহান মালিহা, মিলিতা মেহেজাবিন আলভী, লায়লা জাহান নাবিলা, নাফিসতা মীম, চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। দগ্ধদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন ও তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খানও রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হঠাৎ সিলিন্ডার বিস্ফোরণ কিংবা রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই কাঠের তৈরি তিনতলা ভবনটিতে আগুন দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়ে। সমুদ্রের তীব্র বাতাস এবং ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, ফায়ার এক্সটিংগুইশার, হোস পাইপ বা অগ্নিসংকেত না থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রের বাইরে চলে যায়।
ভবনটির দোতলা ও তিনতলায় পর্যটকদের থাকার আটটি কক্ষ ছিল। কাঠ পুড়ে যাওয়ায় এবং বের হওয়ার বিকল্প কোনো প্রশস্ত পথ না থাকায় অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এমনকি তিনতলার দুটি শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি অনেকের; সেখানেই দমবন্ধ হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
দায়িত্বে ভয়ানক অবহেলা ও আইনি পদক্ষেপ
দুর্ঘটনার পর থেকেই রিসোর্টের মালিক তানভির এবং অন্য দায়িত্বশীলরা আত্মগোপনে চলে গেছেন এবং তাঁদের মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে পুলিশ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলামকে আটক করেছে। মালিক ও দায়িত্বশীলদের ধরতে অভিযানে নেমেছে পুলিশ।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, মাত্র সাত-আট মাস আগে গড়ে ওঠা এই রিসোর্টটির জায়গা নিয়ে বিরোধও ছিল। খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তার আগেই কাঠের স্থাপনাটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়।
ঘটনার পরপরই কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে অতিরিক্ত জেলা হাকিমকে প্রধান করে ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ইনানী সমুদ্রসৈকত এলাকায় এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা রোধে পর্যটন জোনের সব হোটেল, মোটেল ও ইকো-রিসোর্টের নিরাপত্তা জোরদার এবং লাইসেন্স যাচাইয়ের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।