করোনা মহামারীর কারণে তিন বছর বন্ধ থাকার পর আবারও দেশসেরা দুর্গোৎসবের আয়োজন করেছে বাগেরহাটের শিকদারবাড়ি। দর্শক টানতে বরাবরের মতো এবারও প্রতিমায় আনা হয়েছে নানা বৈচিত্র্য। থাকছে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিযুগে আর্বিভূত দেব-দেবী। পূজা মণ্ডপে সাজানো হয়েছে ৫০১টি প্রতিমা। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
এদিকে শিকদারবাড়ির দুর্গোৎসবের আয়োজনের খবরে দর্শনার্থী ও ভক্তদের মধ্যে আনন্দ-উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে। এরিমধ্যে একনজর দেখতে তারা আসা শুরু করেছেন পূজা প্যান্ডেলে। শান্তিপূর্ণ উৎসব উদযাপনে তৎপর রয়েছে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন।
বাগেরহাট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের কর্মকর্তাদের দাবি, হাকিমপুর শিকাদারবাড়িতে দুর্গোৎসবের এই আয়োজন পৃথিবীর সেরা। ব্যক্তি উদ্যোগে শিকদারবাড়ি পারিবারিক পূজামণ্ডপ ছাড়া কোথাও এর চেয়ে বেশি সংখ্যক দেব-দেবীর প্রতিমা সাজিয়ে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়নি। পারিবারিক এই পূজামণ্ডপে প্রতি বছর শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন ধরে রাখতে চায়; এমন আশার কথা শুনিয়েছেন আয়োজকরা।
মঙ্গলবার শিকদারবাড়ি পূজামণ্ডপে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে প্যান্ডেল। প্যান্ডেলে বেশ কয়েকটি সারিতে আলাদা আলাদাভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা। প্রতিমার প্রতিটি সারি যেন যুক্ত আছে দুর্গার মূল মণ্ডপের সঙ্গে। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তুলে ধরা হয়েছে প্রতিমার মাধ্যমে।
বিশাল এই পূজা প্যান্ডেলে ঘুরে দেখা গেছে, ঘোড়ায় চড়ে দুর্গার মর্ত্যলোকে আগমন এবং গমন, বিভিন্ন দেব-দেবীর সৃষ্টি রহস্য, নারায়ণের অনন্ত শয্যা, সমুদ্র মন্থন, সীতা হরণ, শ্রীকৃষ্ণের অষ্টসখী, ৬৫ ফুট দৈর্ঘ্য কুম্ভকর্ণ দেখা গেছে। এছাড়া প্রতিমার মাধ্যমে দেব-দেবীর নানা চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বাগেরহাট সদর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামে শিকদারবাড়ির পারিবারিক এই পূজামণ্ডপে ২০১১ সালে ২৫১টি প্রতিমা সাজিয়ে প্রথম দুর্গোৎসব শুরু হয়। এরপর প্রতিবছর ওই পূজামণ্ডপে বাড়ানো হয়েছে প্রতিমার সংখ্যা। সবশেষ ২০১৯ সালে ৮০১টি দেব-দেবীর প্রতিমা সাজিয়ে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই তিন বছর শিকদারবাড়ির দুর্গোৎসব বন্ধ ছিল। শুধু ধর্মীয় রীতি রক্ষায় অল্প পরিসরে পূজার আয়োজন করা হয়েছিল।
শিকদারবাড়ি দুর্গাপূজার আয়োজক লিটন শিকদার জানান, সনাতন ধর্ম সম্পর্কে মানুষদের উজ্জীবিত করতে বাবা স্বর্গীয় ডা. দুলাল কৃষ্ণ শিকদার বৃহত্তর পরিসরে দুর্গোৎসব শুরু করে গেছেন। তার ধারাবাহিকতায় এবারও বড় পরিসরে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
লিটন শিকদার আরও জানান, আইনশৃঙ্খলরক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১০০টি সিসি ক্যামেরা। তল্লাশির মধ্যে দিয়ে দর্শনার্থীদের পূজামণ্ডপে প্রবেশ করতে হবে।
বাগেরহাট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি নিলয় কুমার ভদ্র বলেন, দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ ভক্ত ও দর্শনার্থী দুর্গোৎসবে শিকদারবাড়ি পূজা প্যান্ডেলে আসেন।
প্রতিমার কারিগর বিজয় কৃষ্ণ বাছাড় জানান, পাঁচ মাস ধরে ১৫ জনে মিলে শিকদারবাড়ির এই পূজামণ্ডপে বিভিন্ন দেব-দেবীর ৫০১টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি নানা রঙ আর অলঙ্কার দিয়ে প্রতিমা নানাভাবে সাজানো হয়েছে।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত খান জানান, শিকদারবাড়ি দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর করতে পুলিশের পক্ষ থেকে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেওয়া হবে। সাদা পোষাকেও পুলিশ থাকবে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহা. খালিদ হোসেন জানান, উৎসব নির্বিঘ্ন করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
এবার বাগেরহাট সদর, কচুয়া ,মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, মোংলা, রামপাল, ফকিরহাট, মোল্লাহাট ও চিতলমারী উপজেলা মিলে জেলার ৯টি উপজেলায় এবছর ৬৫২টি পূজা মণ্ডপে দুর্গা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। জেলার প্রতিটি সর্বজনীন পূজা মণ্ডপে সরকারিভাবে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
২০ অক্টোবর বেলতলায় ষষ্ঠী পূজার মধ্যে দিয়ে দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গ থেকে মর্তে আসবেন। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং ২৪ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে আবারও ঘোড়ায় চড়ে দুর্গা ফিরে যাবেন স্বর্গলোকে।