শক্তি সঞ্চার করে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। ‘মিধিলি’ নামের ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সাগর উত্তাল থাকায় সতর্ক সংকেতও বদলে দেওয়া হয়েছে। আর এ পরিস্থিতিতে বাগেরহাটের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকার মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছে।
শুক্রবার বেলা ১২টা পর্যন্ত জেলার শরণখোলার বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন দুই হাজার নারী-পুরুষ। আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
মোংলা বন্দরে জাহাজে পণ্য ওঠা-নামার কাজও বন্ধ রয়েছে। বন্দরের অবস্থানরত নৌযান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরে তাদের নিজস্ব অ্যালার্ট জারি করেছে।
বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে বাগেরহাটে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। শুক্রবার ভোর থেকে মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। সেইসাথে ঝড়ো বাতাসও বয়ে যাচ্ছে।
শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, বাগেরহাট শহরের শালতলা, সাধনার মোড়, রাহাতের মোড়, মিঠাপুকুর এলাকা, খারদ্ধার, পোস্ট অফিসের সামনেসহ শহরের বিভিন্ন সড়কে বৃষ্টির পানি জমে আছে। নদ-নদীতেও স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পানি বেড়েছে।
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলাসহ বিভিন্ন নদী পাড়ে ১৮৫ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ না থাকায় জোয়ারে পানি বৃদ্ধি পেলে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বলেশ্বর নদী পাড়ের ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসায় নদী পাড়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দরিদ্র আর নিম্ন আয়ের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলায় ১০টি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। দুর্গত এলাকার মানুষদের আশ্রয়ের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৭৯টি সাইক্লোন সেল্টার।
শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত বাগেরহাটে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে মোংলা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। সুন্দরবনে টেলিটকের মোবাইল নেটওয়ার্ক কয়েকদিন ধরে বন্ধ থাকায় বনে কর্মরত স্টাফদের সাথে টেলিযোগাযোগও বন্ধ।
বাগেরহাটের মোংলা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হরুর অর-রশীদ জানান, শুক্রবার দুপুর থেকে ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রভাগ খেপুপাড়া নিকট দিয়ে মোংলা-পায়রা উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করেছে। এটি আরও উত্তর-উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে সন্ধ্যা নাগাদ উপকূল অতিক্রম করতে পারে। ঝড়টি বর্তমানে মোংলা বন্দর থেকে ১৪৫ কিলোমিটার দুরে আছে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহা. খালিদ হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় মিধিলি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরণের প্রস্তুতি রয়েছে। দুর্গত এলাকার মানুষদের আশ্রয় নেওয়ার জন্য ৩৭৯টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। দুই হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রয়েছে। সেই সাথে শুকনা খাবার, ৬৫ মেট্রিক টন চাল এবং ৯ লাখ নগদ টাকা মজুত আছে। এরিমধ্যে দুর্গত মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছে। শুক্রবার বেলা ১২টা পর্যন্ত দুই হাজার মানুষ শরণখোলা উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম জানান, সুন্দরবনের কটকায় কয়েকদিন ধরে টেলিটকের নেটওয়ার্ক বন্ধ রয়েছে। ফলে সুন্দরবনে কর্মরত স্টাফদের সাথে টেলিযোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া বেশ কিছু ট্রলার নিয়ে সহস্রাধিক জেলে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। সুন্দরবনের দুবলার চরে শুটকি মৌসুমে মাছ শুকানোর কাজে সেখানে থাকা কয়েক হাজার জেলে নিরাপদ স্থানে রয়েছে।
দুবলার চরে থাকা কয়েকজন জেলে জানান, শুটকি মৌসুম চলছে। ১০ হাজার জেলে দুবলার চরে মাছ শুকানোর কাজ করছে। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে শুটকির বেশ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।