শনিবার থেকে দুবলার চরে শুরু রাস উৎসব

বঙ্গোপসাগরের মোহনায় সুন্দরবনের দুবলার চরে শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিন ব্যাপী ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব। সাগর পাড়ে শ্রীকৃষ্ণের রাস উৎসবকে ঘিরে এরি মধ্যে সব ধরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এবার রাস উৎসবে শুধু সনাতন ধর্মের মানুষ। 

এদিকে রাস উৎসবকে ঘিরে শনিবার থেকে সোমবার এই তিন দিন সুন্দরবনে আগত ভক্ত ছাড়া সব ধরণের প্রবেশে পাশপারমিট বন্ধ করেছে বন বিভাগ। ভক্তরা নির্ধারিত পাঁচটি রুট দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করে আবার একই রুট দিয়ে ফেরত যাবেন। সবাই জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হবে। রাসকে ঘিরে জেলা, পুলিশ প্রশাসন ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বন বিভাগের বেশ কয়েকটি টিম বৃহস্পতিবার থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে টহল শুরু করেছে।

বাগেরহাট জেলাধীন সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের আওতাধীন দুবলার চরে প্রায় ২৩০ বছর ধরে শ্রীকৃষ্ণের রাস উৎসব উদযাপন করা হচ্ছে। সনাতন ধর্মের মানুষের বিশ্বাস,  রাস উৎসবে রাতভর শ্রীকৃষের পূজা-অর্চনা শেষে পরে দিন ভোরে সূর্য উদয়ের আগরে সাগরের লোনা জলে পুণ্যস্নান করলে সব ধরণের পাপমোচন এবং মনোবাসনা পুর্ণ হয়। 

সেই বিশ্বাস নিয়ে প্রতিবছর বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষরা দুবলার চরে রাস উৎসবে সমবেত হয়। সময়ের বিবর্তনে দুবলার চরে রাস উৎসব এক সময়ে সব ধর্মের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু নিরাপত্তাসহ নানা দিক বিবেচনা করে এবার শুধুমাত্র সনাতন ধর্মের মানুষদের রাসে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। রাস উৎসবে এবার বন্ধ থাকছে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কীর্তন। সেখানে শুধুমাত্র রাসপূজা ও পুণ্যস্নান অনুষ্ঠিত হবে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র এবং পরিবেশের কথা বিবেচনায় নিয়ে কোনো অবস্থাতেই সেখানে প্লাস্টিক ব্যবহার করা যাবে না। 

সুন্দরবন বিভাগ জানায়, শনিবার সকালের ভাটায় পুণ্যার্থীরা সুন্দরবন বিভাগের নির্ধারিত রাজস্ব জমা দিয়ে নির্ধারিত রুট দিয়ে লঞ্চ এবং ট্রলার নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করবেন। রোববার সন্ধ্যায় পূজা-অচর্না শেষে সোমবার ভোরে পূণ্যস্নানের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে রাস উৎসব। ওই দিন সন্ধ্যার মধ্যে পুণ্যার্থীরা ফিরে আসবেন। কোনো অবস্থাতেই পুণ্যার্থীরা আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে পারবেন না।

বন বিভাগের তথ্য মতে, সরকার নির্ধারিত জনপ্রতি পুণ্যর্থীদের তিন দিনের জন্য ৭৫ টাকা, নিবন্ধনযুক্ত প্রতিটি ট্রলারের (৩দিন) জন্য ৩০০ টাকা, নিবন্ধনবিহীন প্রতিটি ট্রলারের (৩দিন) জন্য এক হাজার টাকা এবং প্রতিটি ট্রলারের অবস্থান ফি (প্রতিদিন) বাবদ সরকারকে ৩০০ টাকা রাজস্ব দিতে হবে।

যে পাঁচ রুট দিয়ে পুণ্যার্থীরা রাস উৎসবের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবেন সেগুলো হলো, ঢাংমারী/চাঁদপাই ষ্টেশন-ত্রিকোনা আইল্যান্ড হয়ে দুবলার চর। বগী-বলেশ্বর-সুপতি স্টেশন-কচিখালী-শেলারচর হয়ে দুবলার চর। বুড়িগোয়ালিন, কোবাদক থেকে বাটুলা নদী-বল নদী-পাটকোষ্টা খাল হয়ে হংসরাজ নদী অতঃপর দুবলার চর। কয়রা, কাশিয়াবাদ, খাসিটানা, বজবজা হয়ে আড়ুয়া শিবসা অতঃপর শিবসা নদী-মরজাত হয়ে দুবলার চর। নলিয়ান স্টেশন হয়ে শিবসা-মরজাত নদী হয়ে দুবলার চর। 

দুবলার চরে রাস উৎসব আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ বসু সন্তু জানান, সরকারের নির্দেশনা মেনে সেখানে রাসপূজা ও পুণ্যস্নান অনুষ্ঠিত হবে। সব ধরণের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। শনিবার সকালের ভাটায় পুণ্যার্থীরা লঞ্চ, ট্রলার ও নৌকা নিয়ে দুবলার চরে রওনা হবে। লোকালয় থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে দুবলার চরে বিকালের মধ্যে তারা পৌঁছে যাবে। ১০ হাজার পুণ্যার্থী রওনা হবে রাসে। 

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার আবুল হাসনাত খান জানান,দুবলার চরে রাস উৎসবকে ঘিরে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। পুণ্যার্থীদের সুন্দরবনে প্রবেশ থেকে শুরু করে ফিরে আসা পর্যন্ত গৃহিত সবধরণের সিদ্ধান্ত মানতে হবে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহা. খালিদ হোসেন জানান, রাসের এই আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সুন্দরবন বিভাগ, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সদস্যরা নানাভাবে দায়িত্ব পালন করছে।