সুন্দরবনে ৯ ফুট লম্বা ও ছয় মণ ওজনের মৃত বাঘ উদ্ধার

পূর্ব সুন্দরবনের টাইগার পয়েন্ট থেকে একটি পুরুষ বাঘের মরদেহ উদ্ধার করেছে বনরক্ষীরা। ৯ ফুট লম্বা মৃত বাঘটির ওজন ২৫৫ কেজি, বয়স আনুমানিক ১৫ বছর।

সোমবার বিকেলে কচিখালী ফরেস্ট অফিসের বনরক্ষীরা টহলের সময় টাইগার পয়েন্ট খালে বাঘটিকে ভাসতে দেখেন।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা শেখ মাহবুব হাসান জানান, কচিখালী টহল ফাঁড়ির বনরক্ষীরা মৃত বাঘটি উদ্ধার করে অফিসে নিয়ে আসে। বাঘটির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ধারনা করা হচ্ছে বার্ধক্যজনিত কারনে বাঘটির মৃত্যু হয়েছে। 

তিনি বলেন, বাঘটি একদিন আগে মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মৃত ওই বাঘটি সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র সংরক্ষণ করা হবে। 

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে জানান,  ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর বাঘটির মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। 

একই কথা জানান বাগেরহাট জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. ছাহেব আলী। তিনি আরও জানান, বাঘের বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে। 

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম  জানান, বাঘ রক্ষায় সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সুন্দরবনে বাঘসহ বন্যপ্রাণির আবাসস্থল বৃদ্ধি করা হয়েছে। মোট ছয় লাখ এক হাজার ৭০০ হেক্টর বনের মধ্যে এখন তিন লাখ ১৭ হাজার ৯০০ হেক্টর অভয়ারণ্য এলাকা। আগে ছিল মাত্র এক লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর। 

২০১৭ সালে সরকার সুন্দরবনে অভায়ারণ্য এলাকা সম্প্রসারণ করে। সুন্দরবনে বাঘের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল ফাঁড়ির কার্যক্রমের পাশাপাশি স্মার্ট পেট্রোল করা হচ্ছে। বাঘ যাতে সুন্দরবন ছেড়ে লোকালয়ে বের হতে না পারে এজন্য বনের সীমানা এলাকায় বন বিভাগের টহল বাড়ানো হয়েছে। সার্বক্ষণিক বন বিভাগ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। 

বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বন বিভাগের তথ্য মতে, ২০০১ সাল থেকে ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৩ কছরে সুন্দরবনে নানা ভাবে ৪১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে ২ টি এবং পশ্চিম বিভাগে ১৬টি বাঘের মৃত্যু হয়। কখনো চোরাশিকারির হাতে বাঘের প্রানহানি ঘটছে। আবার সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে বের হলে গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছে বাঘ। আর ঝড়-জলোচ্ছাসেও বাঘের মৃত্যু হচ্ছে। এছাড়া অসুস্থ্য হয়ে এবং বাধ্যক্ষজনিত কারণে বাঘ মারা যাচ্ছে সুন্দরবনে। এই সময়ের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ২০টি বাঘের চামড়া।  

২০১৮ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুসারে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি। বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা জানতে ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনার কাজ চলছে। বাঘ রক্ষায় নানা মুখী উদ্যো নেওয়ায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বন বিভাগ আশা করছে।

বন বিভাগ জানায়, এর আগে ২০২২ সালের ২৮ জানুয়ারি সুন্দরবনের দুবলার চরের কাছে রুপার খাল থেকে মৃত অবস্থায় একটি বাঘ উদ্ধার করে বন বিভাগ। ২০২১ সালের মার্চ মাসে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ভোলা নদীর ধনচেবাড়িয়ার চর থেকে মৃত অবস্থায় একটি বাঘ উদ্ধার করা হয়। ২০২০ সালের জুলাই মাসে মাত্র সাড়ে ৫ মাসের ব্যবধানে সুন্দরবন পূর্ব এবং পশ্চিম বিভাগের আওতাধীন এলাকায় বনে দুইটি বাঘ মরে পড়েছিল। পরে বন বিভাগের সদস্যরা  থেকে মৃত অবস্থায় ওই বাঘ দুটি উদ্ধার করে।

সুন্দরবনে প্রতিটি বাঘ তাদের আবাসস্থলের জন্য ১৪ থেকে ১৬ বর্গ কিলোমিটার (হোমরেঞ্জ) চিহ্নিত করে সেখানে বাস করে। আর গোটা সুন্দরবন জুড়েই রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিচারন করে থাকে। জলবায়ুপরিবর্তন জনিত হুমকির কারণে লবণাক্ততা,ঝড়-জলোচ্ছাস এবং নদীর স্রোত প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করছে বাঘ। নদী-খাল ভারাট হওয়ার কারণে বাঘ মাঝে মধ্যে সুন্দরবন ছেড়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। বন সংলগ্ন গ্রামে ঢুকে পড়লে গ্রামবাসীর হাতে মাঝে মধ্যে বাঘের প্রাণহানি ঘটে। আর সুন্দরবনে চোরাশিকারিদের তৎপরাতা একেবারে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, বাঘের আটটি উপ-প্রজাতির তিনটি এরিমধ্যে বিশ্ব থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের মাত্র ১২টি দেশে বাঘের অস্তিত্ব রয়েছে। সারা বিশ্বের বন উজাড়, শিকারী ও পাচারকারীদের কারণে বাঘ মহাবিপন্ন প্রাজতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।