রিমালেও ভাসলো বাগেরহাটের চিংড়ি চাষীদের স্বপ্ন

বাগেরহাটে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস হলেই সাদাসোনা খ্যাত চিংড়ি শিল্পের বিপর্যয় ঘটে। এবারের ঘূর্ণিঝড় রিমালে এর ব্যতিক্রম হয়নি। এর আগে ইয়াস, বুলবুল, আইলা, সিডরসহ বিভিন্ন সময়ে নানা নামে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই অঞ্চলে হাজার হাজার মৎস্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাছ ভেসে গিয়ে চাষীদের শত শত কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। 

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য বলছে, সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় রিমালের ফলে জেলায় ৩৫ হাজার মাছের ঘের ডুবে চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাদামাছ ও  কাঁকড়া পানিতে ভেসে গেছে। টাকার অঙ্কে এর ক্ষতির পরিমাণ এখন পর্যন্ত ৭৩ কোটি টাকা। তবে আরও বাড়তে পারে। 

সরেজমিন জেলার রামপাল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলোচ্ছ্বাসে অনেক ঘেরের বাঁধ ভেঙে পানিতে মিশে গেছে। খণ্ডখণ্ড ঘের পানিতে মিশে একাকার হতে দেখা গেছে। অনেকে ঘেরের বাঁধে নেট দিয়ে উঁচু করেও শেষরক্ষা হয়নি। কেউ কেউ আবার ঘেরের বাঁধ মাটি দিয়ে উঁচু করেও ব্যর্থ হয়েছেন। জেলার সদর, মোংলা এবং মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চিত্র প্রায় একই রকম। 

চাষীরা বলছেন, জোয়ারে পানি বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস আর অতিবৃষ্টিতে হলেই ঘের ডুবে চিংড়ি ভেসে যায়। তেমনি অতিরিক্ত খরা আর ভাইরাসে মরছে চিংড়ি। এবার ঘূর্ণিঝড় রিমালে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে তাদের চিংড়ি ঘের ডুবে মাছ ভেসে গেছে। প্রায় প্রতিবছর নানাভাবে চিংড়িঘের ওপর দুর্যোগ লেগে থাকছে। তাই তারা আগ্রহও হারাচ্ছেন, খুঁজছেন বিকল্প। আর চিংড়ি চাষী নেতাদের দাবি, সুদমুক্ত ঋণ এবং বিমার। 

এদিকে বছরের শুরুতে চিংড়ির পোনা সঙ্কট ছিল। তার পর প্রচণ্ড খরার কারণে অনেক ঘেরে চিংড়ি মারাও গেছে। এরপর ঘূর্ণিঝড় রিমাল। 

এর আগে ইয়াস, বুলবুল, আইলা, সিডরসহ বিভিন্ন সময়ে নানা নামে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই অঞ্চলে আঘাত হেনেছে। হাজার হাজার মৎস্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চাষীদের শত শত কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। 

রামপালের চাষী সমীর বরণ জানান, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চিংড়ি চাষ করে আসছেন। মোট আট বিঘা জমিতে তার মৎস্য ঘের রয়েছে। রিমালের জলোচ্ছাসে তার ঘেরে বাঁধ লণ্ডভণ্ড  হয়ে পানি ঢুকে পড়ে চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ কয়েক লাখ টাকা। 

উপজেলার চন্ডিতলা গ্রামের আনোয়ার হোসেনও দীর্ঘদিন ধরে চিংড়ি চাষ করছেন। তারও দাবি, প্রায় প্রতিবছর নানা প্রাকৃতি দুর্যোগের কারণে চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এবার রিমালে জলোচ্ছ্বাসে ঘেরের সব চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। 

রামপাল, মোংলা, মোড়েলগঞ্জ এবং বাগেরহাট সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজন চিংড়ি চাষীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এক সময় চিংড়ি চাষ লাভজনক থাকলেও নানা কারণে এখন তা আর নেই। রিমালের আগে এতো বেশি জলোচ্ছ্বাসও দেখেনি তারা। বার বার লোকসানে আগ্রহ কমে আসছে।  

বাগেরহাট জেলা চিংড়ি চাষী সমিতির সভাপতি মহিতুল ইসলাম সুমন জানান, একের পর এক বিপর্যয়ে চিংড়ি চাষীরা এখন সর্বশান্ত। প্রকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার চিংড়িঘের ডুবে কোটি কোটি টাকার চিংড়ি ভেসে যাচ্ছে। লোকসানের মুখে অনেকে আর চিংড়ি চাষ করতে চায় না। 

তার দাবি, ঘুর্ণিঝড় রিমালের জলোচ্ছ্বাসে জেলায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছ ভেসে গেছে। এ অবস্থায় প্রাকৃতি বিপর্যয় থেকে এ শিল্পকে রক্ষা করতে চিংড়ি চাষীদের প্রণোদনা এবং বিমার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এএসএম রাসেল জানান, ঘুর্ণিঝড় রিমালের ঘেরের ওপর দিয়ে তিন থেকে চার ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৩৫ হাজার মৎস্যঘের ডুবে গেছে। প্রাথমিক হিসেবে ৭০ কোটি টাকার চিংড়িসহ সাদা মাছ এবং তিন কোটি টাকার ঘেরের অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

তিনি মনে করেন, চিংড়ি চাষীদের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে অনুদানের পাশাপাশি অল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া দরকার।

মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় ৫৬ হাজার  হেক্টর জমিতে ৭৪ হাজার ৭০০টি মৎস্যঘের রয়েছে। জেলায় মোট মৎস্য চাষীর সংখ্যা ৫৫ হাজার।