বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাড়িঘর থেকে সুন্দরবন, বেড়িবাঁধ, মৎস্যঘের সর্বত্রই রিমালের ক্ষত চিহৃ। জেলায় এক নারীর প্রাণও কেড়ে নিয়েছে রিমাল। জেলায় মানুষের ৪৫ হাজার বাড়িঘর কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনে জলোচ্ছ্বাসে বণ্যপ্রণীকূল আবাস্থল হারিয়ে ফেলেছে। গোটা জেলায় ঝড়ের তাণ্ডবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
জেলা প্রশাসক মোহা. খালিদ হোসেন জানিয়েছেন জেলার ৭৫টি ইউনিয়নের সব কয়টিতেই রিমালের ক্ষত রয়েছে। টাকার এই ক্ষতির পরিমাণ বহু।
আর ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, রিমালের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে তাদের দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। দীর্ঘ সময় ধরে তা-ব চালানো রিমাল ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টি আর জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সহায় সম্পদ। রিমালের মতো দীর্ঘ সময়ের ঝড় তারা আগে দেখেনি।
সুন্দরবন
রিমালের তাণ্ডবে বিশ্বঐহিত্য সুন্দরবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জলোচ্ছ্বাসে বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থল হারিয়ে ফেলে। পানিতে ভেসে যাওয়ার সময় বিভিন্ন স্থান থেকে ১৮টি জীবিত হরিণ উদ্ধার করা হয়। পরে সেগুলো বনে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া মৃত অবস্থায় ১৩৪টি হরিণ, চারটি শূকর উদ্ধার করে বন বিভাগের সদস্যরা। ঝড়ে ভেঙে পড়ে বনের বিভিন্ন অংশে বহু গাছপালা। একই সঙ্গে লবণ পানি ঢুকে সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী, বনের স্টাফ এবং বনজীবীদের জন্য খনন করা ৮০টি মিষ্টি পানির পুকুর ডুবে যায়। এছাড়া বন বিভাগের বিভিন্ন কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লবণ পানি দীর্ঘ সময় বনের মধ্যে জমে থাকায় বন্যপ্রাণীর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, রিমালের তাণ্ডবে সুন্দরবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গাছপালার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর অনেক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছাসে সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী আবাস্থল হারিয়ে ফেলে। রিমালের তাণ্ডবে বন বিভাগের বিভিন্ন স্থাপনার সাড়ে ছয় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বনপ্রাণী ও বনের গাছপালার ক্ষয়ক্ষতি সরেজমিনে দেখে তালিকা করার জন্য খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো এবং সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা পাওয়ার পর সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যাবে।
মৎস্য বিভাগ
রিমালে জলোচ্ছ্বাসে বাগেরহাটে সাদাসোনা খ্যাত চিংড়ি শিল্পের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানির চাপে মৎস্য ঘেরের বেড়িবাঁধ ভেঙে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। ডুবে গেছে ৩৫ হাজার মৎস্য ঘের। কোটি কোটি টাকা মূল্যের চিংড়ি, কাঁকড়া এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভেসে গেছে। হাজার হাজার চাষি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এএসএম রাসেল জানান, জেলায় রিমালের জলোচ্ছ্বাসে ৩৫ হাজার চিংড়ি ঘেরে ডুবে গেছে। পানিতে ঘেরের চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভেসে গেছে। সব মিলে ঘের ডুবে ৭৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে চাষিদের তথ্য মতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ বিভাগ
রিমালের আঘাতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে। বিদ্যুতের ১৫১টি পোল ভেঙে যায়, এক হাজার ৫৮০টি স্থানে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে যায়, ট্রান্সমিটারসহ বিদ্যুতের বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গোটা জেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জেলার পাঁচ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়ে। পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য মতে তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি টাকা।
বাগেরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ব্যবস্থাপক সুশান্ত রায় জানান, রিমালের তাণ্ডবে জেলায় তাদের ১৫১টি পোল ভেঙে গেছে। বিদ্যুৎ লাইনের উপর বিভিন্ন স্থানে দুই হাজার ১৭২টি গাছ হেলে পড়ে, এক হাজার ৫৮০টি স্থানে বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে গেছে। ৩৭টি ট্রান্সমিটার ক্ষতিগ্রস্ত, ৫২৭টি মিটার ক্ষতিগ্রস্ত, ৭০টি ক্রস আর্ম ভেঙে যায়, ৪৭২টি সার্ভিস ড্রপ তার ছিড়াসহ বিভিন্ন ধরণের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি টাকা
নদী পাড়ের বেড়িবাঁধ
রিমালের জলোচ্ছ্বাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নদী পাড়ের বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাগেরহাট সদরে ভৈরব নদী ও মোড়েলগঞ্জে পানগুছি নদী পাড়ে কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাগেরহাটের সবকটি নদ-নদীতে বিপদ সীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিলো। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতায় নদীতে পানি দেখা গেছে।
বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান মোহাম্মদ আল-বিরুনী জানান, জেলায় তাদের মোট ৩৩৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। রিমালের জলোচ্ছ্বাসে ৩৫ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ১৫টি স্থানে ৩৭৭ মিটার বাঁধ ভেঙে গেছে। বিভিন্ন নদীর ৪০টি স্থান দিয়ে বাঁধের উপর দিয়ে পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করে। তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছয় কোটি টাকা।
কৃষিতেও তাণ্ডব চালিয়েছে রিমাল
রিমালের তাণ্ডবে বাগেরহাটে বিভিন্ন ধরণের কৃষিপণ্যে ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ো বাতাসে ক্ষতির পাশাপাশি পানিতে ভেসে গেছে অনেক ধরণের কৃষিপণ্য।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শংকর কুমার মজুমদার জানান, রিমালে জেলা তাদের ১১ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমির বিভিন্ন ধরণের কৃষিপণ্য আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে পাট, তীল, সবজি, আম, পেঁপে, কলা, পানসহ বিভিন্ন ধরণের কৃষি পণ্য রয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে এসব কৃষিপণ্য আক্রান্ত হয়েছে।
প্রাণীসম্পদের ক্ষতি
ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রাণীসম্পদের নানাভাবে ক্ষতি হয়েছে। গবাদি পশু মারা যাওয়ার পাশাপাশি অনেক এলাকায় পশুখাদ্য নষ্ট হয়ে গেছে। হাঁস-মুরগির মৃত্যু হয়েছে। অনেক খামারি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাগেরহাট জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা সাহেব আলী জানান, রিমালের তাণ্ডবে বাগেরহাটে ৭টি গরু, ২২টি ছাগল, ৫০০টি হাঁস, ৫টি ভেড়া, আট হাজার ১৬৯টি মুরগী মারা গেছে। সেই সাথে প্রায় ৫০ লাখ টাকার গো-খাদ্যে নষ্ট হয়েছে। তাদের মোট ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি দুই লাখ ৯৯ হাজার ৭০০ টাকা।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহা. খালিদ হোসেন জানান, জেলার ৭৫টি ইউনিয়নের সবকটিতেই রিমালের ক্ষত চিহৃ রয়েছে। দুর্যোগকালীন সময়ে জেলার বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্র ৭০ হাজার মানুষ আশ্রয় নেয়। সেই সাথে মানুষ তাদের গবাদী পশুও আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসে। আশ্রয় নেওয়া দুর্গত মানুষকে শুকনা খাবারের পাশাপাশি খিচুড়ি এবং নানা ধরণের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলায় তাৎক্ষনিকভাবে ৭৫ মেট্রিকটন চাল, ১৯ লাখ টাকা, ১০ হাজার ১০০ কেজি চিড়া,৭০০ কেজি গুড়,২০ হাজার প্যাকেট বিস্কুট, ৮৪০ লিটার পানি দেওয়া হয়। প্রাথমিক তালিকায় ১০ হাজার বাড়িঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৩৫ হাজার বাড়িঘর আংশিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। জেলায় মোট পাঁচ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে।