বেতন-ভাতার বাইরে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ এবং বিভিন্ন থানা ও ইউনিটে ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালনের অভিযোগে খুলনা রেঞ্জের আওতাধীন ২৮ পুলিশ সদস্যকে একযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রত্যাহার হওয়া সদস্যদের মধ্যে কনস্টেবল থেকে শুরু করে উপপরিদর্শক (এসআই), সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এবং পুলিশের বাবুর্চিও রয়েছেন। শুক্রবার খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় থেকে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়।
পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন থানা, জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত সদস্যদের প্রত্যাহারের আওতায় আনা হয়েছে।
যশোরের কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই বাবর আলী এবং চৌগাছা থানার এসআই শান্ত, ঝিনাইদহ সদর থানার এসআই রোকনুজ্জামান ও কনস্টেবল রবিউল ইসলাম এবং কালীগঞ্জ থানার এসআই সোহাগ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানার এসআই লিংকন সরকার, ভেড়ামারা থানার কনস্টেবল রাকিব হোসেন ও জাকির হোসেন এবং ট্রাফিক বিভাগের কনস্টেবল সৈয়দ মোল্লার নাম প্রত্যাহারে তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা ট্রাফিক বিভাগের কনস্টেবল আকরামকেও প্রত্যাহারের তালিকায় রাখা হয়েছে।
খুলনা জেলার দাকোপ থানার ঝাড়ুদার পাবলিক রাসেল, দিঘলিয়া থানার এসআই লিটন ও কনস্টেবল রব, পাইকগাছা থানার এসআই রবিউল ও এসআই কামরুজ্জামান, কয়রা থানার এএসআই জাহিদ, রূপসা থানার এসআই শহিদুল, তেরখাদা থানার পুলিশের বাবুর্চি সোহেল এবং ডুমুরিয়া থানার কনস্টেবল মহসিনের নাম রয়েছে। এছাড়া খুলনা জেলা গোয়েন্দা শাখার কনস্টেবল রাসেল ও ইমরুলকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বাগেরহাট সদর থানার কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন, মোল্লাহাট থানার কনস্টেবল পুলক বিশ্বাস, চিতলমারী থানার কনস্টেবল মো. জাহিদুর রহমান, ফকিরহাট থানার এসআই অমিত কুমার মণ্ডল, রামপাল থানার কনস্টেবল স্বরূপ হালদার, মোংলা থানার পাবলিক আলম হোসেন, মোড়েলগঞ্জ থানার এসআই মো. কিশোর কুমার, শরণখোলা থানার এসআই তুষার কান্তি পাল এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার কনস্টেবল মো. আহাদ আলীও প্রত্যাহার হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন থানা ও ইউনিটে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এসব সদস্যের বিরুদ্ধে ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালনের অভিযোগ ছিল। বেতন-ভাতার বাইরে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের দায়িত্ব আইন প্রয়োগ, অপরাধ প্রতিরোধ এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো সদস্য ব্যক্তিগত স্বার্থে অনৈতিক সুবিধা নিলে তার প্রভাব পড়ে পুরো বাহিনীর ওপর। বিশেষ করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মামলা গ্রহণ, তদন্ত কিংবা অভিযানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশ সদস্যদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করা। কিন্তু আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির পরও যদি কোনো সদস্য অনৈতিক উপায়ে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত অসততার বিষয় থাকে না; বরং বাহিনীর শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির কাঠামোর দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে। এ ধরনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রত্যাহার বা বদলির মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম বলেন, দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। এ কারণে প্রথমে বাহিনীর ভেতরে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ধরনের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশের ওপর জনআস্থা তৈরির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। আইজিপি মহোদয়েরও এ ধরনের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় খুলনা রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন জেলায় একযোগে এ শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।