হাঁসের খামারের জোগানে হাওর উজাড়, হুমকিতে ডিঙ্গাপোতা হাওর

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ডিঙ্গাপোতা হাওরে বর্ষার কয়েক মাস ধরে চলছে আশঙ্কাজনক হারে শামুক আহরণ। রাতভর জাল ও নানা যন্ত্রের সাহায্যে সংগৃহীত এই শামুক ভোরে হাওরের পাড়ে তুলে বস্তাভর্তি করে পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন হাঁসের খামারে। স্থানীয় অসচ্ছল পরিবারগুলোর জন্য এটি জীবিকার অন্যতম মাধ্যমে পরিণত হলেও, নির্বিচারে শামুক তোলার ফলে চরম হুমকির মুখে পড়ছে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জলজ জীববৈচিত্র্য।

সরেজমিন, প্রতিদিন ভোরে তেঁতুলিয়া গ্রামের হাটে বসছে শামুকের পাইকারি বাজার। রাতভর সংগ্রহ করা শত শত বস্তা শামুক সেখানে স্তূপ করে রাখা হয়। কম খরচে হাঁসের পুষ্টিকর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা সহজ হওয়ায় খামারিদের কাছে শামুকের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই চাহিদাকে ঘিরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক হাওর থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে।

তবে এভাবে নিয়মিত অনিয়ন্ত্রিত শামুক আহরণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা। তাদের আশঙ্কা, প্রাকৃতিক এই সম্পদ অতিরিক্ত মাত্রায় তুলে নিলে অচিরেই হাওরে শামুকের প্রাকৃতিক মজুত শেষ হয়ে যাবে, যার সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়বে সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থায়।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘শিক্ষা সংস্কৃতি পরিবেশ ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি’র সভাপতি নাজমুল কবির সরকার বলেন, প্রতিদিন এভাবে শামুক আহরণ করা হলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়বে। এতে হাওরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি একসময় প্রজাতিটি বিলুপ্ত হওয়ার বড়ো ঝুঁকি রয়েছে। এ বিষয়ে অবিলম্বে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শামুক কেবল হাঁসের খাদ্য নয়; এটি হাওরের সূক্ষ্ম খাদ্যশৃঙ্খল ও জলজ প্রতিবেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। মাছসহ নানা জলচর প্রাণীর প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে এবং পানির গুণগত মান রক্ষায় শামুকের ভূমিকা অপরিহার্য। ফলে এভাবে নির্বিচার আহরণ অব্যাহত থাকলে হাওরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে।

ঘটনার বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের নেত্রকোনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মতিন জানান, প্রতিবেশব্যবস্থার কোনো একটি উপাদান অতিরিক্ত মাত্রায় ধ্বংস করা হলে পুরো পরিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

একদিকে দরিদ্র মানুষের জীবিকার প্রয়োজন, অন্যদিকে হাওরের পরিবেশ রক্ষা—দুটি দিক বিবেচনা করে দ্রুত শামুক আহরণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা