চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত তিন মাসে জেলায় চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুজনই মারা গেছে চলতি মার্চ মাসে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোট শিশু রোগীর প্রায় ৪০ শতাংশই হামে আক্রান্ত। ছোঁয়াচে এই রোগের প্রাদুর্ভাব সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় হাসপাতালের কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটকে সাময়িকভাবে আইসোলেশন ওয়ার্ড ঘোষণা করা হয়েছে।
রোববার (২৯ মার্চ) সরেজমিন, হাসপাতালের অস্থায়ী আইসোলেশন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায় করুণ চিত্র। ২০ বেডের নির্ধারিত জায়গায় বর্তমানে ৭১ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। শয্যা সঙ্কটে এক বিছানায় দুই শিশুকে রাখা হয়েছে, বাকিদের ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে। গাদাগাদি করে থাকা এসব শিশুর সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সদর উপজেলার মহারাজনগর থেকে আসা তুনজেরা খাতুন জানান, তার সাড়ে আট মাস বয়সী ছেলেকে সব টিকা দেওয়ার পরও সে হামে আক্রান্ত হয়েছে। বেড না পেয়ে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি মাসে মাত্র দুই জন রোগী ভর্তি হলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে পাঁচজনে দাঁড়ায়। তবে মার্চ মাসে সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নেয়। এ মাসে এখন পর্যন্ত ২৪৩ জন হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ১৬৫ জন ছেলে এবং ৭৮ জন মেয়ে। রোববার এক দিনেই নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৪৬ জন।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত তিন মাসে মোট চারজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত তিন মাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩২০ জন। তবে বহির্বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে যাওয়া রোগীদের ধরলে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে।
হাসপাতালে আইসিইউ, সিসিইউ বা ডায়ালাইসিস সুবিধা না থাকায় জটিল রোগীদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চিকিৎসকরা। শ্বাসকষ্ট ও গুরুতর জটিলতা থাকা প্রায় ৮০ জন শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে মাত্র দুইজন শিশু বিশেষজ্ঞ দিয়ে আইসোলেশন ইউনিটের চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজ রায়হান জানান, মূলত ৯ বছরের কম বয়সী এবং যারা টিকা নেয়নি, তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে। হাঁচি-কাশি ও সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। হামের পর শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তাই পরবর্তী তিন মাস শিশুকে প্রচুর পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।
তিনি আরও জানান, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের অনেকের মধ্যে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ হামের প্রকোপ বাড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে টিকাদানে কোনো ঘাটতি বা অসচেতনতা এর পেছনে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মু. মশিউর রহমান বলেন, রোগীর চাপ সামলাতে আমরা ডায়ালাইসিস ইউনিটকে আইসোলেশন ওয়ার্ড করেছি। ডাক্তার ও নার্স সঙ্কটের মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আইসিইউ ও সিসিইউ চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে।