শতভাগ বিদ্যুতের দেশে কেমন আছে গ্রাহক?

এত উৎপাদন, তবু গ্রামে এখনো লোডশেডিং কেন?

শতভাগ বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ করলো বাংলাদেশ। সেইসঙ্গে বিশ্বের ১৩তম আল্ট্রা-সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশে পরিণত হল ৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশ।

পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধনকালে সোমবার (২১ মার্চ) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মুজিব শতবর্ষে শতভাগ’ বিদ্যুৎ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট, যার গ্রাহক ছিলো ১ কোটি ৮০ লাখ। 

বিদ্যুতই সেই আলো, যে আলোতে অর্থনীতির প্রাথমিক মুক্তি ঘটে। 

তাই, ২০২১ সালের মধ্যে সেই উৎপাদন সক্ষমতা ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবার অঙ্গীকার করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

বর্তমানে ২০২২ সালে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট। আর গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ২১ লাখ। 

বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার এই বিশাল উন্নতির পরও বিদ্যুৎ খাতকে ঘিরে রয়েছে নানা প্রশ্ন- 

উৎপাদন বাড়লেও বিতরণ ব্যবস্থা দুর্বল কেন? 

উৎপাদন সক্ষমতার ৭ শতাংশ বসিয়ে রেখে ৯ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হচ্ছে কেন? 

সরকার কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছিল সাময়িক, এখন সেটিই কি স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে? 

অভিযোগ রয়েছে, সেখানে উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে, এবং সঞ্চালন ও বিতরণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি বলে সরকারের ভর্তুকি বাড়ছে। 

এতো উৎপাদনের পরও কেন গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে? 

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন, বিশেষ করে সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে। এসব বিতর্ক-প্রশ্ন নিয়ে কি ভাবছে সরকার? 

এসব প্রশ্ন সোমবার (২১ মার্চ) রাতে একাত্তর মঞ্চে সঞ্চালক নূর সাফা জুলহাজ হাজির করেছিলেন ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বীর বিক্রম, প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টার সামনে। 

আগে পত্রিকায় শিরোনাম দেখা যেতো 'খাম্বা আছে, বিদ্যুৎ নাই'। সেখান থেকে এখন আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তবুও দৈনিক সরবরাহ মাত্র ৯ হাজার মেগাওয়াট কেন?

জুলহাজের এমন এক প্রশ্নের জবাবে ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী '২০২২ সালের ২১ মার্চ বাংলাদেশের সব মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এলো এবং এটা একটা বড় সুখবর' মন্তব্য করে বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা গড় ব্যবহারের চেয়ে অনেক বেশি রাখতে হয় কারণ দিনের গড় চাহিদা আর সর্বোচ্চ চাহিদার পার্থক্য বিস্তর। সারাদিনের গড় চাহিদা ৭-৮ হাজার হলেও সন্ধ্যায় এই চাহিদা পৌঁছে ১২-১৩ হাজার মেগাওয়াটে। আর গরমের সময় এই চাহিদা ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াটে গিয়ে দাঁড়াবে। 

ফলে ওই সময়ের চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যবস্থাপনা রাখতে না পারলে ওই সময় সবাইকে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবেনা বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী উপদেষ্টা। 

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় ১০-১৫% ব্যয় হয় ব্যবস্থাপনায়, আরও ১০-১৫% যায় স্পিনিং রিজার্ভ যা থেকে পিক ও অফ পিক লোডের সময়ে বিদ্যুৎ চাহিদার ওঠা-নামা সামাল দেয়া হয়। 

ফলে এই যে ২৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তার সাড়ে সাত হাজার মেগাওয়াটই যাচ্ছে মেইন্টেনেন্স আর স্পিনিং রিজার্ভে, বলেন ড. ইলাহী। 

এছাড়াও ভবিষ্যতের বাড়তি চাহিদা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়টিও সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার সময়ও মাথায় রাখতে হবে উল্লেখ করে ড. ইলাহী মন্তব্য করেন, নতুন শিল্পকারখানা হলে তাদের বসিয়ে রেখেতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবেনা, বিদেশি বিনিয়োগ এলে বলা যাবেনা, 'আপনারা বসুন, আমরা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়ে নিই!' 

এসময় সঞ্চালক জুলহাজ উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার জন্য উৎপাদন কম হচ্ছে বলে যে অভিযোগটি রয়েছে, সেটি উত্থাপন করেলে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, এটি ঠিক নয়। 

বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা স্বীকার করে নিয়ে ড. তৌফিক-ই-ইলাহী বলেন, কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তা উৎপাদন ব্যাহত করছে। 

বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতি হলে হয়তো বিদ্যুতের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেতো, অলস লোডের ব্যবহার বাড়ত, জানান তিনি। 

গ্রামের মানুষ এখনও দিনের ২৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ পায়না উল্লেখ করে ড. ইলাহী বলেন, এটা ক্রমানুসারে ঠিক করতে হবে। 

বিদ্যুৎ খাতে শুধুমাত্র উৎপাদনেই ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নিজস্ব বিনিয়োগ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এমনকি আমাদের বিশেষজ্ঞরাও ভাবতে পারেনি, বাংলাদেশ নিজে ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারবে। 

দেশে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে জানিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আগামী দুই বছর পর সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি থাকবেনা। 

সঞ্চালক নূর সাফা জুলহাজ এসময় উল্লেখ করেন এতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরেও এখনও লোডশেডিং রয়ে যাবার কথা। এর প্রেক্ষিতে ড. ইলাহী বলেন, এটাকে ঠিক লোডশেডিং বলা যাবেনা, এটি আমাদের সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। 

এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাতারবাড়ি, পায়রা, রামপাল, রূপপুরে সঞ্চালন স্টেশন হচ্ছে, বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করতে দেশজুড়ে হচ্ছে অসংখ্য সাব-স্টেশন। 

ইতিমধ্যেই এর সুফল পেতে শুরু করেছেন জনগণ উল্লেখ করে ড. ইলাহী বলেন, আগের চেয়ে অনেক কমেছে বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি। গ্রামের মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি সময় বিদ্যুৎ পায় এবং ক্রমান্বয়ে সারাক্ষণই পাবে। 

এদিন একাত্তর মঞ্চে যুক্ত অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

কিন্তু আসলেই তা কতোখানি তা সুস্পষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্যাস-নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ যৌক্তিক হবে না বলে তাতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। কিন্তু তার উৎপাদন ক্ষমতাও হয়তো মোট উৎপাদন ক্ষমতায় এখনও রয়ে গেছে। 

ফলে কার্যকরী উৎপাদন ক্ষমতা আসলে ততো বেশি নয়, যতোটা কাগজে-কলমে দেখানো হয়, বলেন ড. মনসুর। 

এসময় সঞ্চালক নূর সাফা জুলহাজ উল্লেখ করেন, এই যে উৎপাদন সক্ষমতার ৭ শতাংশ বসিয়ে রেখে ৯ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হচ্ছে- সেটা কতটুকু যৌক্তিক? 

এমন প্রশ্নের জবাবে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, কিছুটা অতিরিক্ত সক্ষমতা রাখতে হবে, সেটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। 

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কতটুকু হবে সেটা এবং তা কার্যকরী কিনা। ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত সক্ষমতা নিশ্চয়ই গ্রহণযোগ্য নয়, বলেন তিনি। 

এসময় সঞ্চালক নূর সাফা জুলহাজ জানান, বিদ্যুৎ খাতে মোট উৎপাদন ক্ষমতার ৪৩ শতাংশ মাত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, ৫৭ শতাংশ বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হচ্ছে। এটা কতটুকু যৌক্তিক সে বিষয়ে তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। 

এর প্রেক্ষিতে ড. তৌফিক-ই-ইলাহী বলেন, এই সমালোচনা যুক্তিযুক্ত নয়। 

বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার 'পিক চেজিং' দিকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শীতকালে গরম থাকবে না, সেচ থাকবে না, তখন চাহিদা প্রায় অর্ধেক কমে যাবে। কিন্তু, সেগুলো যখন ফিরে আসবে তখনতো যাদুর কাঠি দিয়ে আর সক্ষমতা বাড়িয়ে ফেলা যাবে না। 

ফলে এই বাড়তি সক্ষমতা আমাদের রাখতেই হবে, বলেন তিনি। 

একাত্তর/জো