জলবায়ু টাইম বোমা: হিমালয়ে গলতে থাকা হিমবাহ

সম্প্রতি নেপাল ও চীন সীমান্তে ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও কাদা-পাথরের ধস বিশ্বজুড়ে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। চার হাজার ফুট উপর থেকে হিমবাহের বিশালাকার বরফের স্তূপ হঠাৎ খসে পড়ে ঘটে যাওয়া এই বিপর্যয়কে শুরুতে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্প বলে ভুল করা হয়েছিল। কিন্তু ভূতাত্ত্বিক ও হিমবাহ গবেষকদের মতে, এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পুরো হিমালয় অঞ্চলে তৈরি হওয়া এক ভয়াবহ বৈজ্ঞানিক বিপদের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

বিগত দুই দশক ধরে নেপালের খুম্বু অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করা ভূবিজ্ঞানীদের মতে, বুধবারের ওই ধস এবং হঠাৎ বয়ে যাওয়া প্লাবনের ঘটনাটি ছিল একটি মারাত্মক বিপর্যয়ের সূচনা মাত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের লাগাম টানা না গেলে ২০২৪ সালে থামে গ্রামের ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা সাম্প্রতিক এই ঘটনার মতো আরও অনেক বড় বিপর্যয় সামনে অপেক্ষা করছে।

Nepal Glacial Lakes 05
চার হাজার ফুট ওপর থেকে ধস ও এক রহস্যময় বিপর্যয়:
গবেষকদের তথ্যানুযায়ী, একটি সুবিশাল হিমবাহ পর্বতগাত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ৪,০০০ ফুট নিচে চীন ভূখণ্ডের ভোটে কোশী নদীর এক উপনদীতে আছড়ে পড়ে। এতে প্রচণ্ড আঘাতে পর্বত কেঁপে ওঠে এবং মুহূর্তেই পাথর ও পানির প্রচণ্ড স্রোত গিরিয়ং পোর্ট ভবনসহ পুরো উপত্যকা ধ্বংস করে বয়ে যায়।

সাধারণত হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের বন্যা ঘটে হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া 'মোরেইন বাঁধ' বা পলির বাঁধ ভেঙে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হিমবাহ যখন নেমে আসত, তখন তা পাহাড় চূর্ণ করে শত শত ফুট উঁচু কাদা ও পাথরের স্তূপ তৈরি করত, যাকে ভূতাত্ত্বিক ভাষায় বলা হয় মোরেইন। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ ছোট হয়ে গেলে এই মোরেইনের পেছনে বরফগলা পানি জমে বড় বড় হ্রদে পরিণত হয়। তবে গত বুধবারের ঘটনায় কোনো হিমবাহ হ্রদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা না থাকায় এটি ভূতাত্ত্বিকদের কাছে এক বিরল ও নতুন গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, চার হাজার ফুট উপর থেকে বরফ খসে পড়ার তীব্র আঘাতে হয়তো মুহূর্তেই তা পানিতে পরিণত হয়েছিল।

Nepal Glacial Lakes 04
হিমবাহ হ্রদের ক্যানসার ও 'সুইস চিজ' প্রতিক্রিয়া:
হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের গলে যাওয়া এবং হ্রদ তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত ও বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুরুর দিকে নেপালের দীর্ঘতম 'নগোজুম্পা' হিমবাহের পাশে, যেটিকে একটি ছোট পানির ডোবা হিসেবে দেখা যেত, ২০২৫ সালের গবেষণায় দেখা যায় সেটি প্রায় ৭৫০ ফুট চওড়া এবং ৮৫০ ফুট লম্বা এক বিশাল হ্রদে রূপ নিয়েছে।

হিমবাহের ওপর জমা হওয়া পাথরের কাদা ও পলি পানিকে কালচে রঙের করে তোলে। কালো রঙ সূর্যালোক শোষণ করে পানিকে গরম করে তোলে। এই উষ্ণ পানি ভেতরে বরফ গলিয়ে গুহার মতো টানেল তৈরি করে, যা পুরো হিমবাহকে ভেতরের দিক থেকে 'সুইস চিজ'-এর মতো ঝাঁঝরা করে ফেলে।

১৯৫০-এর দশকে ইমজা হিমবাহের ওপর অল্প কিছু ছোট ডোবা ছিল। ১৯৭৮ সালে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ হ্রদে পরিণত হয় এবং ২০২১ সাল নাগাদ এটি ১.৭ মাইল দীর্ঘ এবং ৪৯৮ ফুট গভীর এক বিশালাকার হ্রদে রূপ নেয়, যা শুধু বরফ ও বালুর এক নড়বড়ে বাঁধে আটকে আছে। ২০১৬ সালে নেপালি সেনাবাহিনী গভীর পরিখা খনন করে এই হ্রদের পানি কিছুটা না কমালে এর আগে ১৯৮৫ সালের মতো আরেকটি প্রলয়ঙ্করী বন্যা অনায়াসেই ঘটতে পারতো।

Nepal Glacial Lakes 01
২১০০ সালের দিকে মহাবিপর্যয়ের সংকেত:
বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি কার্বন নিঃসরণ অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে হিমালয়, কারাকোরাম, পামির, হিন্দুকুশ ও তিয়েন শান পর্বতমালা নিয়ে গঠিত 'হাই মাউন্টেন এশিয়া' অঞ্চলের প্রায় ৭৫ শতাংশ হিমবাহ ২১০০ সালের মধ্যে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

হিমবাহ গলে উন্মুক্ত হওয়া খাদে জমা পাওয়া হাজার হাজার হ্রদ এখন স্থানীয় জনপদের মাথার ওপর একেকটি 'টাইম বোমার' মতো ঝুলছে। অতীত উপাত্ত বলছে, ১৯০০ সাল থেকে চীন-নেপাল সীমান্তে কয়েক ডজন এমন হিমবাহ ধস ও আভালান্সের ঘটনা ঘটেছে। ভূতাত্ত্বিকরা স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিচ্ছেন যে, পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা পানির এই দানবগুলোকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে আগামী দিনগুলোতে আরও বহু জনপদ মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস