বিশ্বে কি এখন আগের চেয়ে বেশি ভূমিকম্প হচ্ছে?

চলতি বছরে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বেশি সংখ্যায় ভূমিকম্প হচ্ছে কিনা, এই বিষয়ে কাতারভিক্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এক দশকের ভূমিকম্পের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে চলতি বছরের সার্বিক পরিস্থিতি এবং ভূমিকম্পের সৃষ্টি ও উপকেন্দ্র সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে।

গত এক মাসে ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোতে ৭ বা তার বেশি মাত্রার তিনটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন শত শত মানুষ। এর আগে জুন মাসে উত্তর ভেনেজুয়েলায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

পরপর এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রতিবারের মতোই একটি প্রশ্ন জোরদার হয়ে উঠেছে, পৃথিবী কি আগের চেয়ে বেশি কেঁপে উঠছে?

Venezuela earthquake 07
২০২৬ সালের ১০টি বৃহত্তম ভূমিকম্প

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ২০,০০০ ভূমিকম্প নথিভুক্ত হয়; যা দিনে গড়ে প্রায় ৫৫টি। তবে এসব কম্পনের বেশিরভাগই এতটাই মৃদু যে সাধারণ মানুষ তা অনুভবই করতে পারে না।

সাধারণত ৬ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলেই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়।

২০২৬ সালে নিবন্ধিত ১০টি সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটি রেকর্ড করা হয় জুনে, ফিলিপাইনের মিন্দানাও উপকূলে। ৭.৮ মাত্রার ওই ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। জুন মাসেই ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ৬,৩০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া জুলাইয়ে মেক্সিকো এবং আগস্টে কলম্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় আঘাত হানা সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর মাত্রা ছিল ৭.৪ বা তার চেয়ে বেশি।

Colombia quake 07
গত ১০ বছরের চিত্র ও ২০২৬ সালের অবস্থান

২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে ১৩৩টি ৬ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে সবচেয়ে কম (৯৯টি) এবং ২০২১ সালে সবচেয়ে বেশি (১৫৭টি) বড় আকারের ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।

চলতি বছরের আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৬ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ৯১টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১টির মাত্রা ছিল ৭-এর ওপরে। এই সংখ্যা দুটি আগের এক দশকের গড় হারের চেয়ে সামান্য বেশি হলেও সার্বিকভাবে তা স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই রয়েছে। তাছাড়া এখন পর্যন্ত ৮ বা ৯ মাত্রার মতো অতীব বিধ্বংসী কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি।

একটি ভূমিকম্প কতটা মারাত্মক হবে, তা কেবল তার মাত্রার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা কোথায় আঘাত হানছে সেটাই মূখ্য। রিখটার স্কেলের পরিমাপের চেয়েও ভূমিকম্পের গভীরতা, লোকালয়ের সান্নিধ্য এবং স্থানীয় ভবনের গঠনকাঠামোর মজবুতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত এক দশকের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পগুলো কিন্তু সর্বোচ্চ মাত্রার ছিল না; সেগুলো ছিল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ঠিক তলদেশে আঘাত হানা কম্পন।

Earthquake 04
ভূমিকম্পের নির্দিষ্ট কোনো ঋতু’ আছে কি?

না, ভূমিকম্পের কোনো নির্দিষ্ট ঋতু নেই। দীর্ঘমেয়াদী তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বছরজুড়েই ভূমিকম্প ঘটতে পারে এবং এর কোনো নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক বিন্যাস নেই। ইউএসজিএস-এর বিজ্ঞানীরা জানান, টেকটোনিক প্লেটের সীমারেখা বরাবর কয়েক দশক বা শতাব্দী ধরে যে চাপ সঞ্চিত হয়, তা ১২ মাসের কোনো ঋতুচক্রের সাথে বাঁধা নয়। ফলে ঠিক কখন বড় ভূমিকম্প আঘাত হানবে, তা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়।

ভূমিকম্পের পর কয়েক মাস বা এমনকি বছরজুড়েও ‘আফটারশক’ বা অনুকম্পন চলতে পারে।

নির্দিষ্ট কোনো ভূমিকম্পের সময় পূর্বাভাস দেওয়ার বদলে ভূ-বিজ্ঞানীরা মূলত নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কতটা, তা গণনা করেন। এই হিসাবের ওপর ভিত্তি করেই জীবনরক্ষাকারী ভবন নির্মাণ বিধিমালা (বিল্ডিং কোড) তৈরি করা হয়। এছাড়া ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সাথে সাথে সতর্কবার্তা পাঠানোর জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও কার্যকর রয়েছে।

Earthquake 01
ভূমিকম্প কীভাবে ঘটে
?

সহজ কথায়, পৃথিবীর ভূত্বক বা ওপরের স্তর যখন হঠাৎ কেঁপে ওঠে, তখনই ভূমিকম্প ঘটে।

পৃথিবীর বাইরের এই শক্ত খোলসটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) পুরু কতগুলো ভাসমান টুকরো বা ‘টেকটোনিক প্লেট’-এ বিভক্ত। এগুলো নিচে থাকা উত্তপ্ত ও অর্ধ-গলিত শিলার ওপর অবস্থান করে, যা লাখ লাখ বছর ধরে ধীরে ধীরে প্লেটগুলোকে ঠেলতে ও টানতে থাকে।

প্লেটগুলো সবসময়ই সচল থাকে, তবে এদের সীমানা অনেক সময় একে অপরের সাথে আটকে যায়। এতে প্রচুর চাপ সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে শিলা ভেঙে ‘ফল্ট’ বা চ্যুতিরেখা বরাবর ভূত্বক কেঁপে ওঠে। এই চ্যুতিরেখাগুলো শত শত কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। অনেক প্রধান চ্যুতিরেখা মানচিত্রে চিহ্নিত করা থাকলেও কিছু নতুন চ্যুতিরেখা কেবল ভূমিকম্প ঘটলেই আবিষ্কৃত হয়।

Earthquake 03
ভূমিকম্প কোথায় বেশি ঘটে
?

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হলো ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’ বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমিকম্প এই অঞ্চলেই ঘটে। এই বলয়টি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। জাপান, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া এই রিং অব ফায়ারের অন্তর্ভুক্ত।

তবে এই বলয়ের বাইরেও ভূমিকম্প হতে পারে। জাভা থেকে হিমালয় হয়ে তুরস্ক ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ‘আলপাইড বেল্ট’-এ বিশ্বের বড় ভূমিকম্পগুলোর প্রায় ১৭ শতাংশ ঘটে থাকে। এছাড়া প্লেটের সীমানা থেকে অনেক দূরে প্রাচীন চ্যুতিরেখা থেকেও কদাচিৎ কম্পন সৃষ্টি হতে পারে।

Earthquake 02
ভূমিকম্প কীভাবে মাপা হয়
?

ভূমিকম্পের আকার বা তীব্রতা মাপা হয় ‘মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল’-এ, যা কম্পনের উৎস থেকে নির্গত শক্তির পরিমাণ নির্দেশ করে।

এটি একটি লঘুগাণিতিক বা লগারিদমিক স্কেল। অর্থাৎ, স্কেলে মাত্রা ১ বাড়ার অর্থ হলো ভূকম্পনের তীব্রতা ১০ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং নির্গত শক্তির পরিমাণ প্রায় ৩২ গুণ বেড়ে যাওয়া।

বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে:

৪ থেকে ৪.৯ মাত্রা: হালকা ভূমিকম্প হিসেবে গণ্য হয়, তবে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

৫ মাত্রা: ৪ মাত্রার চেয়ে ১০ গুণ বেশি ভূকম্পন সৃষ্টি করে এবং প্রায় ৩২ গুণ বেশি শক্তি নির্গত করে। এতে কাঁচা বা দুর্বল ভবনে মাঝারি ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

৬ মাত্রা: শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে ধরা হয়। এটি ৪ মাত্রার চেয়ে ১০০ গুণ বেশি ভূকম্পন এবং প্রায় ১,০০০ গুণ বেশি শক্তি নির্গত করে।

৭ মাত্রা: বড় আকারের ভূমিকম্প, যা ভবন ও অবকাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি এবং ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

৮ বা তার বেশি মাত্রা: অতি ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প। এটি বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনতে পারে।

ভূমিকম্প কতটা প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক হবে, তা নির্ভর করে এর মাত্রা, গভীরতা, লোকালয়ের সানিধ্য, মাটির ধরণ এবং সুনামি বা ভূমিধসের মতো দ্বিতীয় পর্যায়ের দুর্যোগ সৃষ্টির আশঙ্কার ওপর।

Chili Earthquake
ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প কোনগুলো
?

ইতিহাসে নথিভুক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি ঘটেছিল ১৯৬০ সালের ২২ মে চিলির ভালদিভিয়াতে। ৯.৫ মাত্রার ওই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের ফলে পুরো প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল।

এর চার বছর পর, ১৯৬৪ সালে আলাস্কার প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ড অঞ্চলে ৯.২ মাত্রার দ্বিতীয় শক্তিশালী ভূমিকম্পটি রেকর্ড করা হয়।

এছাড়া ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার উপকূলে ৯.১ থেকে ৯.৩ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট সুনামিতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রায় ২,২৮,০০০ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছিল।